আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে দুই প্রভাবশালী ডানপন্থী নেতার মধ্যকার ঠান্ডা লড়াই এবার রূপ নিয়েছে প্রকাশ্য ও তীব্র দ্বন্দ্বে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মধ্যকার সম্পর্ক এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অত্যন্ত অদ্ভুত ও ব্যঙ্গাত্মক ‘মিম’ শেয়ার করে এই দ্বন্দ্বের আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প রসিকতা ও উপহাসের ছলে বোঝাতে চেয়েছেন যে, ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনি নাকি তাকে নিয়ে রীতিমতো মেতে আছেন এবং তার প্রতি দুর্বল! এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’–এ ৮০ বছর বয়সি ডোনাল্ড ট্রাম্প মেলোনির সঙ্গে নিজের একটি ফটোশপ করা (এডিট করা) ছবি পোস্ট করেন। সেই ছবির ক্যাপশনে ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মকভাবে লেখেন, ‘রেস্ট্রেইনিং অর্ডার দরকার’ (Restraining order needed)। সাধারণ আইনি ভাষায় রেস্ট্রেইনিং অর্ডার বলতে বোঝায় কারও কাছে ঘেঁষার ওপর আদালতের আইনি নিষেধাজ্ঞা। পোস্ট করা ওই ছবিতে দেখা যায়, ৪৯ বছর বয়সি মেলোনি অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল মুখে ট্রাম্পের দিকে তাকিয়ে আছেন। ট্রাম্প এই ছবির মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে দেখাতে চেয়েছেন যে, ইতালির এই নারী প্রধানমন্ত্রী তার ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ এবং তার প্রতি দুর্বল। রোববার (৫ জুলাই) ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের করা একাধিক বিতর্কিত পোস্টের মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত।
একই দিনে ট্রাম্প শুধু মেলোনিকে নিয়েই থামেননি; তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং তার স্ত্রী মিশেল ওবামার একটি ভুয়া ছবিও পোস্ট করেন। ওই ছবিতে দেখা যায়, দেয়াললিখনে (গ্রাফিতি) ভরা একটি বিতর্কিত 'এয়ারফোর্স ওয়ান' বিমানে ওঠার আগে ওবামা দম্পতি হাত নাড়ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধীদের ট্রল বা উপহাস করার পুরনো কৌশলের অংশ হিসেবেই ট্রাম্প এই পোস্টগুলো করেছেন। সবচেয়ে কাকতালীয় এবং কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় হলো, তুরস্কে অনুষ্ঠেয় আসন্ন ন্যাটো (NATO) শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক আগমুহূর্তে ট্রাম্প এই পোস্টটি করলেন। এই হাই-প্রোফাইল আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি ট্রাম্প ও মেলোনির মুখোমুখি বসার কথা রয়েছে। সম্মেলন শুরুর আগেই দুই নেতার এই ভার্চুয়াল যুদ্ধ ন্যাটো জোটের ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সম্মেলনে এই দুই নেতার শারীরিক ভাষা ও আচরণ কেমন হয়, তা দেখার জন্য মুখিয়ে থাকবে পুরো বিশ্ব।
ট্রাম্প ও মেলোনির এই প্রকাশ্য বাগযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটেছিল গত সপ্তাহে। ট্রাম্প একটি জনসভায় বা সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন যে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জি-সেভেন (G7) সম্মেলনে তার সঙ্গে একটি একক ছবি তোলার জন্য মেলোনি ‘বারবার’ অনুরোধ করেছিলেন। ট্রাম্পের ইঙ্গিত ছিল এমন যে, ছবি তোলার জন্য মেলোনি রীতিমতো তার কাছে আকুতি-মিনতি বা ভিক্ষা জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) অভ্যন্তরীণ নীতি ও নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি মন্তব্য করেন, জ্বালানি সংকট ও অবৈধ অভিবাসন ইস্যুতে ইউরোপিয়ান নেতারা একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "তারা যদি এখনই এসব মারাত্মক সমস্যার সমাধান না করে, তবে ইউরোপের ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে যাবে এবং ইউরোপ আর কখনোই আগের মতো থাকবে না। ট্রাম্পের এমন অহংকারী এবং অসম্মানজনক মন্তব্যের পর ইতালি সরকার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেয়। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি তাৎক্ষণিকভাবে তার পূর্বনির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ ওয়াশিংটন সফর বাতিল করেন। একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতালির একটি বড় কূটনৈতিক চপেটাঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের দাবিকে ‘সম্পূর্ণ বানোয়াট, মিথ্যা ও কাল্পনিক’ আখ্যা দিয়ে সরাসরি মাঠে নামেন খোদ জর্জিয়া মেলোনি। ইতালির প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা ‘আডনক্রনস’–এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ইতালীয় জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল ‘রেতে ৪’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মেলোনি ট্রাম্পের অহংকার চূর্ণ করে দেন। মেলোনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আমি আজ আমেরিকাবিরোধী নই; আর গতকাল আমি কারও কাছে হাঁটু গেড়েও বসিনি। আমি এমন একজন মানুষ, যিনি মন থেকে বিশ্বাস করেন যে পশ্চিমারা ঐক্যবদ্ধ থাকলে বেশি শক্তিশালী। আর ইতালি একটি ঐক্যবদ্ধ পশ্চিমা বিশ্বে আরও বেশি শক্তিশালী—এই বিশ্বাস থেকেই আমি অতীতে কাজ করেছি এবং ভবিষ্যতে করে যাব।" ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও যোগ করেন, "তবে এর পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে যে, যেকোনো দৃঢ় ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক সবসময় স্পষ্টবাদিতার ওপর নির্ভরশীল। আর আমি একজন অত্যন্ত স্পষ্টভাষী মানুষ।
উপরে উপরে ছবি তোলা বা মিম শেয়ারের বিষয় মনে হলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এই দুই ডানপন্থী নেতার সম্পর্কের অবনতির পেছনে রয়েছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। মূলত মধ্যপ্রাচ্য নীতি, বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া সাম্প্রতিক কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপে ইতালি সরাসরি সহায়তা করতে অনীহা প্রকাশ করে। মেলোনির এই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ট্রাম্প প্রশাসন ভালোভাবে নেয়নি। এরপর থেকেই এই দুই নেতার ব্যক্তিগত ও কূটনৈতিক সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে, যা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল ও মিমের পর্যায়ে নেমে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী ন্যাটো সম্মেলনে এই দুই নেতার ব্যক্তিগত রসায়ন কোন দিকে মোড় নেয়।