পাথরঘাটা (বরগুনা)
বরগুনার পাথরঘাটা পৌর শহরে দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত। একের পর এক রক্তক্ষয়ী হামলা ও মাদক সরবরাহের মাধ্যমে পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এসব অপরাধী চক্র। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বাজার, জনবসতিপূর্ণ এলাকা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কিশোরদের দলবদ্ধ আড্ডা ও অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের একটি অংশ মাদক বিক্রি ও সেবনসহ বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে এই কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের মধ্যেও চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
খোজ নিয়ে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টম্বর) সন্ধার পরে পাথরঘাটা হাসপাতালের মধ্যে কিশোর গ্যাংয়ের কিছ সদস্য কয়েকটি ছেলে মারধর করছে। স্থানীয় কিছু লোক সেখানে গিয়ে মারধর থামায় দেয়। এ থামিয়ে দেয়ার ঘটনায় পরের দিন বুধবার মাগরিবের নামাজের পরপর কেএম স্কুলের পুকুর পাড়ে নাজিবুল হাসান নুহাস (১৮) নামের কলেজ পড়ুয়া কিশোরের ওপর অতর্কিত সন্ত্রাসী হামলা চালায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় সরাসরি আঘাত এবং শরীরেও বিভিন্ন স্থানে সাইকেলের চেইন দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর যখম করে। বর্তমানে ওই কলেজ শিক্ষার্থী গুরুতর আহত অবস্থায় বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এছাড়াও পাথরঘাটা পৌরশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিনিয়ত মাদক ও মারধর এবং উপজেলার পর্যটন স্পটগুলোতে কিশোরগ্যাংয়ের উৎপাতে মানুষ অতিষ্ঠ বলেও জানা গেছে।
আহত নুহাসের বাবা জামাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের ছেলেরা এখন আর নিরাপদে চলাফেরা করতে পারছে না। সামান্য কথা-কাটাকাটি হলেই এরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। অথচ প্রশাসনিকভাবে এদের দমনে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। চোখের সামনে এরকম অপরাধ করে যাচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা আর প্রশাসন বলে অভিযোগ না হলে ব্যাবস্থা নেয়া যায় না? যেগুলো দৃশ্যমান আপরাধ তার পরেও অভিযোগ দিতে হবে?
নীলিমা পয়েন্ট ঘুরতে আসা এক নারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পরিবার নিয়ে নীলিমা পয়েন্ট একটু স্বস্তিতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। কিন্তু কিছু কিশোরের অনাকাঙ্ক্ষিত চলাফেরা ও অশালীন কথাবার্তা শুনে আমরা খুবই বিব্রত ও আতঙ্কিত বোধ করেছি। এমন সুন্দর একটি পরিবেশ যদি এভাবে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ আর কোথায় গিয়ে স্বস্তিতে ঘোরাফেরা করবে? বিষয়টি প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। শুধুমাত্র অভিযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে পুলিশের উচিত নিজ উদ্যোগেই এসব পয়েন্টে নিয়মিত অভিযান ও টহল বৃদ্ধি করা।
পাথরঘাটাবাসীর অভিযোগ, গত কয়েক বছর ধরে পাথরঘাটায় কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এদের অধিকাংশ সদস্যই স্থানীয় স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী। পড়াশোনা ছেড়ে বা আড়ালে এরা জড়াচ্ছে নানা ধরনের মারাত্মক অপরাধে। বিশেষ করে সন্ধ্যা নামলেই পৌর শহরের নির্জন গলি, স্কুল-কলেজ মাঠসহ বিভিন্ন পয়েন্টে এরা মাদক সেবন ও বেচাকেনার আখড়া বসায়। এখনই যদি এই কিশারগ্যাংয়ের লাগাম টানা না যায় তবে যে কোন সময় বড়ধরনের অপরাধের সাথে জড়াতে পারে তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কিশোর জানান, দুদিন আগে নুহাসকে মেরেছে প্রায় ২০ জন কিশোর। বিকেল থেকেই তারা স্কুলের সামনে অবস্থান নিয়েছিলো। যেভাবে নুহাসকে মেরেছে ওইরকম মানুষকে মানুষ মারতে পারে না। আর দুই মিনিট মারতে পারলে তাকে আর জীবিত পাওয়া যেত না।
বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) খন্দকার আশফাকুজ্জামান জানান, কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিরুদ্ধে বরগুনা জেলা পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে। কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিস্তার রোধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরিতেও পুলিশ কাজ করছে। বরগুনাকে মাদক ও কিশোর গ্যাংমুক্ত রাখতে জেলা পুলিশ সর্বাত্মকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।