টেকসই পল্লী উন্নয়ন, স্মার্ট বাংলাদেশের অগ্রগতি’—এই যুগোপযোগী ও দূরদর্শী প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় যথাযথ মর্যাদায় ও উৎসবমুখর পরিবেশে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস উদযাপিত হয়েছে। আজ ৬ জুলাই (সোমবার) সকালে উপজেলা প্রশাসন এবং উপজেলা পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) যৌথ উদ্যোগে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি, বর্ণাঢ্য র্যালি ও এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং গ্রামীণ অবকাঠামোর সামগ্রিক রূপান্তরের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এ বছর দিবসটি বিশেষ গুরুত্বের সাথে পালন করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য এডভোকেট আবদুল মান্নান। অনুষ্ঠানে উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমবায়ী সদস্য এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বক্তারা প্রত্যেকেই গ্রামীণ জনপদের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ের ওপর বিশেষ জোর দেন।
জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস উপলক্ষে আজ সকাল থেকেই উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিভিন্ন সমবায় সমিতির সদস্য এবং স্থানীয় জনসাধারণের সমাগম ঘটে। সকাল ১০টার দিকে উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে একটি সুসজ্জিত ও বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি উপজেলার প্রধান প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো প্রদক্ষিণ করে। র্যালিতে অংশগ্রহণকারীরা ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ডের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং স্মার্ট পল্লী গড়ার স্লোগান তুলে ধরেন। র্যালি শেষে অংশগ্রহণকারীরা উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত মূল আলোচনা সভায় মিলিত হন।
উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য এডভোকেট আবদুল মান্নান বলেন, “গ্রামীণ অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন ছাড়া দেশের সামগ্রিক ও সুষম উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বর্তমান সরকারের নানামুখী দূরদর্শী পদক্ষেপের ফলে আজ দেশের পল্লী অঞ্চলের অবহেলিত মানুষের ভাগ্য বদলে গেছে। একসময়ের অবহেলিত ও অনুন্নত গ্রামগুলো এখন আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধায় সমৃদ্ধ হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “আমার নির্বাচনী এলাকা নবীনগরের প্রতিটি গ্রামে নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দিতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গ্রামীণ যুবসমাজকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে এবং তাদের স্বাবলম্বী করতে উপজেলা প্রশাসন ও বিআরডিবি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যুবসমাজকে যদি আমরা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, তবে কর্মসংস্থানের সংকট অনেকটাই দূর হবে। পল্লী উন্নয়ন দিবসের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে বিআরডিবি-সহ সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে আরও আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করতে হবে। গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নও আমাদের এই অগ্রযাত্রার একটি বড় অংশ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিষদের নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় বিএনপির শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা। দেশের গ্রামীণ এলাকার সার্বিক উন্নয়নে দলমত নির্বিশেষে সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন বিশেষ অতিথিরা। তারা বলেন, গ্রামীণ জনপদের রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কুটির শিল্পের প্রসারে স্থানীয় নেতৃত্বকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রশাসনের উন্নয়নমূলক কাজে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা। আলোচনা সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা (আরডিও)। তিনি নবীনগর উপজেলায় বিগত বছরগুলোতে বিআরডিবির বাস্তবায়িত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের একটি সংক্ষিপ্ত ও তথ্যবহুল চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, উপজেলার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, প্রান্তিক চাষী ও দুস্থ নারীদের স্বাবলম্বী করতে সহজ শর্তে ঋণ বিতরণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বিগত অর্থবছরগুলোতে দেওয়া ঋণের মাধ্যমে কীভাবে বহু পরিবার দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তি পেয়েছে, তার কিছু সফল উদাহরণ তিনি সভাকে অবহিত করেন। একই সাথে ঋণ আদায়ের সন্তোষজনক হারের কথাও তিনি উল্লেখ করেন এবং আগামী দিনগুলোতে ঋণ বিতরণ পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা ব্যক্ত করেন।
আলোচনা সভার শেষ পর্যায়ে উপজেলার পল্লী অঞ্চলের সফল আত্মকর্মী, শ্রেষ্ঠ সমবায়ী এবং উদ্যোক্তাদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ পুরস্কার ও সনদ বিতরণ করা হয়। বিআরডিবির সহায়তায় যারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন এবং স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রেখেছেন, এমন বেশ কয়েকজন সফল নারী ও পুরুষ উদ্যোক্তার হাতে প্রধান অতিথি ও সভাপতি সম্মাননা স্মারক তুলে দেন। পুরস্কারপ্রাপ্তরা তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে জানান, সরকারের এই ধরনের ঋণ সুবিধা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। সবশেষে সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সমাপনী বক্তব্যে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, নবীনগরের এই উন্নয়নযাত্রা আগামীতে আরও গতিশীল হবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ ও 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গঠনে নবীনগর উপজেলা অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।