*পাহাড়ের প্রাণকেন্দ্রে স্বাস্থ্যসেবার নীরব সংকট: আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনদুর্ভোগ, বাড়ছে জবাবদিহির দাবি*
বিশেষ প্রতিবেদন : মুহাম্মদ সালাহ্ উদ্দীন, স্টাফ রিপোর্টার - আলীকদম, বান্দরবান
বান্দরবান জেলার আলীকদম—প্রকৃতি, পর্যটন সম্ভাবনা এবং বাঙালি, মারমা, ম্রো, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সম্প্রীতির এক অনন্য জনপদ। কিন্তু এই জনপদের প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র, আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে জনসেবার মান নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার ও রাতের খাবার পান না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে সময়মতো খাদ্য গ্রহণ ও ওষুধ সেবনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে খাবার বিলম্বিত হলে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে পারে।
এছাড়া পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডের টয়লেট, বেসিন, পানি সরবরাহ এবং পরিচ্ছন্নতা নিয়েও দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অনেক সময় পর্যাপ্ত পানি থাকে না, কিছু স্যানিটারি ব্যবস্থা অকার্যকর থাকে এবং পরিচ্ছন্নতার ঘাটতির কারণে রোগীরা দুর্ভোগে পড়েন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর স্বল্পতা, জনবল সংকট বা প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছে বলে স্থানীয়রা জানান।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় হাসপাতালের জেনারেটর সবসময় সচল থাকে না। এতে জরুরি অবস্থায় চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং কখনও কখনও বিকল্প আলোর সাহায্যে রোগী দেখতে হয় বলে স্থানীয়দের দাবি।
একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানীয় জলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থার অভাবের অভিযোগও রয়েছে। অনেক রোগী ও তাঁদের স্বজনকে বাইরে থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়, যা নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য অতিরিক্ত কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আলীকদমের মতো দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই অধিকাংশ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা।
তাই ওষুধের প্রাপ্যতা, কার্যকর চিকিৎসা-যন্ত্রপাতি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং সময়মতো রোগীসেবা নিশ্চিত করা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জনস্বার্থে সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা,জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার মূল উৎস। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান জনগণের সেবা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিষ্ঠিত।
ফলে জনগণের ভোগান্তি, অভিযোগ ও প্রত্যাশা তথ্যভিত্তিকভাবে তুলে ধরা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং জনস্বার্থে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার একটি সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
একজন সাংবাদিক বা কলাম লেখকের দায়িত্ব হলো জনগণের বক্তব্য, প্রাপ্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য একসঙ্গে উপস্থাপন করা।
কিন্তু অনেক সময় জনস্বার্থে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যায়িত করার চেষ্টা হয়।
এ ধরনের প্রবণতা গঠনমূলক সমালোচনাকে নিরুৎসাহিত করে এবং প্রকৃত সমস্যার সমাধানকে বিলম্বিত করতে পারে।
এই প্রতিবেদন কোনো ব্যক্তি, কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক নয়।
এর উদ্দেশ্য কেবল জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো তুলে ধরা, যাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।
সময়ের দাবি,"আলীকদমের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে প্রয়োজন—
সময়মতো ভর্তি রোগীদের খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ।
টয়লেট, বেসিন ও ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা,বিশুদ্ধ পানীয় জলের স্থায়ী ব্যবস্থা,জেনারেটরসহ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, চিকিৎসা-যন্ত্রপাতি সচল রাখা।
পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ ও কার্যকর তদারকি,অভিযোগ তদন্ত করে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।
আলীকদমের মানুষের প্রত্যাশা একটাই—পাহাড়ের মানুষ যেন উন্নত, নিরাপদ ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত না হন।
একটি হাসপাতালের প্রকৃত সাফল্য ভবনের আকারে নয়, বরং একজন অসহায় রোগী সময়মতো চিকিৎসা, ওষুধ, খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং সম্মানজনক সেবা পাচ্ছেন কি না—সেই বাস্তবতায়। জনস্বার্থে উত্থাপিত প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরও জনস্বার্থেই খুঁজে পাওয়া উচিত।