কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলায় ফসলি জমি, জমির আইল, রাস্তার ধার এবং পুকুরপাড়ে আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে মারাত্মক ক্ষতিকর আগাছা 'পার্থেনিয়াম'। উপজেলার তালবাড়ীয়া ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে এই বিষাক্ত আগাছার ব্যাপক বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে। অত্যন্ত দ্রুত বংশবিস্তারকারী এই আগাছা কৃষিজ উৎপাদন হ্রাস করার পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দারা। দ্রুত এই আগাছা দমন করা না গেলে উপজেলার কৃষি খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরেজমিনে গোবিন্দপুর গ্রামের বিভিন্ন ফসলের মাঠ ঘুরে দেখা যায়, বিঘার পর বিঘা ফসলি জমি, জমির চারপাশের আইল, পুকুরপাড় এবং আশপাশের পতিত জমিতে ঝাঁকে ঝাঁকে গজিয়ে উঠেছে পার্থেনিয়াম উদ্ভিদ। দূর থেকে দেখতে সাধারণ সবুজ উদ্ভিদের মতো মনে হলেও, এর সাদা ফুল ও ছোট ছোট পাতাগুলো এখন কৃষকদের ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এই আগাছাটি অবিশ্বাস্য গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এক জমি থেকে অন্য জমিতে এর বীজ বাতাস ও পানির মাধ্যমে অতি সহজে স্থানান্তরিত হচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, অতীতে এই অঞ্চলে এমন উদ্ভিদের উপস্থিতি তেমন একটা দেখা যায়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এর বিস্তার এতটাই বেড়েছে যে, এখন সাধারণ ফসল চাষ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্থেনিয়াম অত্যন্ত আগ্রাসী প্রকৃতির একটি আগাছা। এটি যে জমিতে জন্মায়, সেখানকার মাটির পুষ্টি উপাদান, নাইট্রোজেন এবং আর্দ্রতা দ্রুত শোষণ করে নেয়। ফলে মূল ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষক মো. রহমত আলী বলেন, "আমরা জমিতে যে সার ও পানি দিই, তা ফসলের চেয়ে এই আগাছা বেশি শুষে নেয়। ধান ও সবজি ক্ষেতের আইলে এগুলো এত বেশি হয়েছে যে, নিড়ানি দিয়েও শেষ করা যাচ্ছে না। সময়মতো এটি দমন করা না হলে আমাদের ফলন অর্ধেক হয়ে যাবে।" স্থানীয় কৃষকদের আশঙ্কা, এখনই যদি সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে এটি ধ্বংস করা না হয়, তবে আগামী মৌসুমে এই অঞ্চলের প্রধান ফসলগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এতে করে প্রান্তিক কৃষকরা চরম অর্থনৈতিক লোকসানের মুখে পড়বেন।
পার্থেনিয়াম কেবল ফসলেরই ক্ষতি করে না, এটি মানবদেহ ও গবাদিপশুর জন্যও অত্যন্ত বিপজ্জনক। চিকিৎসকদের মতে, এই উদ্ভিদের সংস্পর্শে এলে মানুষের ত্বকে তীব্র অ্যালার্জি, চুলকানি, লাল চাকা হওয়া এবং চামড়া ফেটে যাওয়ার মতো চর্মরোগ দেখা দিতে পারে। এছাড়া এর ফুলের রেণু বাতাসে ভেসে বেড়ায়, যা নিঃশ্বাসের সাথে মানবদেহে প্রবেশ করলে হাঁপানি, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস এবং মারাত্মক শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা এর দ্বারা দ্রুত আক্রান্ত হতে পারে। শুধু মানুষই নয়, গবাদিপশুর জন্যও এটি সমান ক্ষতিকর। মাঠে চড়ার সময় গরু, ছাগল বা মহিষ ভুলবশত এই আগাছা খেয়ে ফেললে তাদের লিভার ও পাকস্থলীর ক্ষতি হয়। অনেক সময় পশুর মুখ থেকে লালা ঝরে এবং ওলন্দা ফুলে যায়। এমনকি পার্থেনিয়ামযুক্ত মাঠে ঘাস খাওয়ার কারণে পশুর দুধ তিতা হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি, এই আগাছাটির ফুল ফোটা এবং বীজ ছড়ানোর আগেই এটিকে গোড়াসহ উপড়ে ফেলে আগুনে পুড়িয়ে দিতে হবে। অন্যথায় এর বিস্তার রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। স্থানীয় যুবক আল-আমিন বলেন, "আমাদের গ্রামের অনেকেই এই আগাছার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানেন না। অনেকে সাধারণ ঘাস মনে করে তা কাটতে গিয়ে চর্মরোগে ভুগছেন। কৃষকদের সচেতন করতে কৃষি বিভাগের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। আশপাশের আরও বিস্তীর্ণ এলাকায় যেন এই বিষাক্ত আগাছা ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য কুষ্টিয়া জেলা ও মিরপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন সর্বস্তরের জনগণ। কৃষকদের সঠিক পরামর্শ প্রদান এবং বিনামূল্যে আগাছানাশক বা দমনের সঠিক উপায় ও প্রশিক্ষণ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।