ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় লেখার অপেক্ষায় মুখিয়ে আছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং আফ্রিকার ফুটবল পরাশক্তি মিশর। ফুটবল বিশ্বের দুই মহানায়ক—লিওনেল মেসি ও মোহামেদ সালাহ। এবার আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন এই দুই মহাতারকা। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আলবিসেলেস্তেদের লক্ষ্য তাদের বিশ্বসেরার মুকুট ধরে রাখা, অন্যদিকে মিশরের 'কিং' মোহামেদ সালাহকে সামনে রেখে আফ্রিকার ফুটবলে এক নতুন রূপকথা ও ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছে 'দ্য ফারাওস' খ্যাত দলটি। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় শুরু হবে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর বা নকআউট পর্বের এই বহুল প্রতীক্ষিত মহা-লড়াই। প্রায় ৭১ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই অত্যাধুনিক ও আধুনিক স্টেডিয়ামটি তার বিশ্বমানের অবকাঠামো, রিট্র্যাকটেবল ছাদ এবং চোখ ধাঁধানো পরিবেশের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। গ্যালারিতে আজ তিল ধারণের ঠাঁই থাকবে না, কারণ টিকিট ছাড়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ম্যাচের সব টিকিট শেষ হয়ে গেছে।
বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ ইতিহাসে আর্জেন্টিনা সব সময়ই অন্যতম প্রধান পরাশক্তি ও ফেবারিট দল হিসেবে মাঠে নামে। তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আলবিসেলেস্তেরা ১৯৭৮, ১৯৮৬ এবং সর্বশেষ ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছে। মারাদোনা থেকে শুরু করে মেসির হাত ধরে বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্য অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছেছে। এবার তাদের সামনে টানা দ্বিতীয় এবং সব মিলিয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের সুবর্ণ সুযোগ। অন্যদিকে মিশর বিশ্বকাপে খুব একটা নিয়মিত দল না হলেও আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম প্রাচীন ও সফল ঐতিহ্যবাহী দল। আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে তাদের রাজত্ব থাকলেও বৈশ্বিক মঞ্চে তারা কখনোই নিজেদের সেরাটা দিতে পারেনি। তবে এবার চিত্রটা ভিন্ন। মোহামেদ সালাহর জাদুকরী নেতৃত্ব এবং একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ ফুটবলারের ওপর ভর করে তারা এবার নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেছে এবং প্রথমবার বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে।
চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত দুর্দান্ত, অপ্রতিরোধ্য ও অবিশ্বাস্য ছন্দে রয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্বে তারা তাদের চিরচেনা আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসেছে। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩–০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করে স্কালোনির শিষ্যরা। দ্বিতীয় ম্যাচে ইউরোপের শক্ত প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ২–১ গোলের লড়াকু জয় তুলে নেয় তারা। আর শেষ ম্যাচে জর্ডানকে ২–০ গোলে হারিয়ে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে 'গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন' হয়ে নকআউটে পা রাখে আলবিসেলেস্তেরা। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ ও রক্ষণভাগের মধ্যে এক দারুণ ভারসাম্য দেখা গেছে। মাঝমাঠে রদ্রিগো ডি পল এবং এনজো ফার্নান্দেজের চতুর পাসিং এবং ফরোয়ার্ড লাইনে লিওনেল মেসির ড্রিবলিং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়েছে। এরপর শেষ বত্রিশের নকআউট ম্যাচে কেপ ভার্দেকে ৩–১ গোলে হারিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী মেজাজে আজ মাঠে নামবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
আর্জেন্টিনার মতো সহজ ছিল না আফ্রিকার প্রতিনিধি মিশরের যাত্রা। তবে তাদের এই যাত্রা ছিল অত্যন্ত লড়াকু এবং নাটকীয়তায় ভরা। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই তারা ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল বেলজিয়ামের মুখোমুখি হয় এবং মাঠের লড়াইয়ে ১–১ গোলে ড্র করে টুর্নামেন্টে নিজেদের আগমনী বার্তা ঘোষণা করে। দ্বিতীয় ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দারুণ এক জয় তুলে নিয়ে নকআউটের পথ প্রশস্ত করে ফারাওরা। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ইরানের সঙ্গে গোলশূন্য (০–০) ড্র করে গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার হয় তারা। মিশরের আসল পরীক্ষা ছিল শেষ বত্রিশের রাউন্ডে। সেখানে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ১–১ গোলে ড্র থাকার পর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। স্নায়ুচাপের সেই কঠিন পরীক্ষায় ৪–২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে আফ্রিকার এই প্রতিনিধিরা। গোলপোস্টের নিচে মিশরের গোলরক্ষকের অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স এবং মোহামেদ সালাহর ঠান্ডা মাথার পেনাল্টি শুট-আউট তাদের এই ঐতিহাসিক জয়ে মূল ভূমিকা পালন করে।
আজকের ম্যাচের স্পটলাইট স্বাভাবিকভাবেই থাকবে দুই দলের দুই অধিনায়কের ওপর। লিওনেল মেসি, যিনি ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে এসেও এখনো যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। অন্যদিকে মোহামেদ সালাহ, যার গতি এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ের সামনে বিশ্বের সেরা সেরা ডিফেন্ডাররাও কেঁপে ওঠেন। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, "মিশর অত্যন্ত গোছানো একটি দল। বিশেষ করে সালাহকে কাউন্টার অ্যাটাকে এক ইঞ্চি জমিও দেওয়া যাবে না। আমরা আমাদের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক ফুটবলটাই খেলব। মিশরের পক্ষ থেকেও হুঙ্কার দিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের কোচের মতে, "আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারে, তবে আমরা এখানে শুধু অংশগ্রহণ করতে আসিনি। আমাদের হারানোর কিছু নেই, কিন্তু পাওয়ার আছে পুরো ইতিহাস। ছেলেরা মাঠে তাদের জীবনের সেরা ফুটবলটা খেলতে প্রস্তুত।"
আজকের ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৪-৩-৩ ফরমেশনে খেলতে পারে, যেখানে মেসির সঙ্গী হতে পারেন হুলিয়ান আলভারেজ বা লাউতারো মার্টিনেজ। অন্যদিকে মিশর ৪-২-৩-১ ফরমেশনে কাউন্টার অ্যাটাক বা প্রতি-আক্রমণ নির্ভর ফুটবল খেলার কৌশল বেছে নিতে পারে, যেখানে সালাহকে মূল স্ট্রাইকার হিসেবে রেখে উইং দিয়ে গতি বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের কৃত্রিম ঘাসের পিচে বলের গতি আজ অন্যতম বড় ফ্যাক্টর হতে পারে। শেষ পর্যন্ত কার মুখে শেষ হাসি ফুটবে? মেসির মুকুট রক্ষা নাকি সালাহর নতুন সূর্যোদয়? উত্তর মিলবে আজ রাতেই। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল ভক্ত এখন ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে আছেন এই ঐতিহাসিক মহারণ উপভোগ করার জন্য।