মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস
এম,এ,মান্নান,স্টাফ রিপোর্টার,নিয়ামতপুর (নওগাঁ)
বিশ্বের মানচিত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ একটি পরাশক্তি। তবে এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। প্রতি বছর ৪ঠা জুলাই অত্যন্ত গৌরব ও মর্যাদার সাথে উদ্যাপিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস, যা বিশ্বজুড়ে 'Fourth of July' নামে পরিচিত। ১৭৭৬ সালের এই দিনে আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনতা ছিন্ন করে নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছিল।অষ্টাদশ শতাব্দীতে উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকারের অন্যায় কর আরোপ (যেমন: স্ট্যাম্প অ্যাক্ট, চা আইন) এবং "প্রতিনিধিত্বহীন কোনো কর নয়" (No taxation without representation) — এই নীতির কারণে উপনিবেশবাদীদের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম নেয়।
এই অসন্তোষ থেকেই শুরু হয় আমেরিকার বিপ্লব বা স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৭৭৫-১৭৮৩)। যুদ্ধের মাঝে, ১৭৭৬ সালের জুন মাসে কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের প্রতিনিধিরা একটি চূড়ান্ত স্বাধীনতা ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেন। থমাস জেফারসনের নেতৃত্বে একটি কমিটি স্বাধীনতার খসড়া ঘোষণা তৈরি করে। অবশেষে, ১৭৭৬ সালের ৪ঠা জুলাই ফিলাডেলফিয়ার 'স্টেট হাউস' (বর্তমানে ইন্ডিপেনডেন্স হল)-এ ঐতিহাসিক "স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র" (Declaration of Independence) আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়।থমাস জেফারসন কর্তৃক লিখিত এই ঘোষণাপত্রটি কেবল আমেরিকার ইতিহাসে নয়, সমগ্র মানবজাতির অধিকারের ইতিহাসে এক অনন্য দলিল। এতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল।"সকল মানুষই সমানভাবে সৃষ্টি হয়েছে এবং সৃষ্টিকর্তা তাদের কিছু অবিচ্ছেদ্য অধিকার দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখের অন্বেষণ।"
এই ঘোষণা আমেরিকার মানুষকে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত লড়াই করার এক নতুন শক্তি ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।আমেরিকানদের কাছে ৪ঠা জুলাই মানেই এক বিশাল উৎসবের দিন। ১৮৭০ সালে এই দিনটিকে প্রথম ফেডারেল ছুটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই দিনটিতে পুরো দেশ লাল, সাদা এবং নীল — এই তিন জাতীয় রঙে সেজে ওঠে। উদ্যাপনের মূল উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে:দেশের ছোট-বড় সব শহরেই বর্ণাঢ্য প্যারেডের আয়োজন করা হয়। সামরিক ব্যান্ড, ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিহিত নাগরিক এবং নানা ধরণের সুসজ্জিত গাড়ি এই প্যারেডে অংশ নেয়।৪ঠা জুলাইয়ের রাতের প্রধান আকর্ষণ হলো চোখ ধাঁধানো আতশবাজির খেলা। নিউ ইয়র্কের 'মেসিস ফোর্থ অফ জুলাই ফায়ারওয়ার্কস' সহ দেশের প্রতিটি প্রান্তের আকাশ এই রাতে আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে।গ্রীষ্মের এই দিনে আমেরিকানরা পরিবার ও বন্ধুদের সাথে নিয়ে ঘরের বাইরে, পার্কে বা সমুদ্রসৈকতে পিকনিক এবং ঐতিহ্যবাহী বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করে। হট ডগ, বার্গার এবং তরমুজ এই দিনের জনপ্রিয় খাবার।এই দিনে সর্বত্র "দ্য স্টার-স্প্যাংগল্ড ব্যানার" (জাতীয় সঙ্গীত), "গড ব্লেস আমেরিকা" বা "আমেরিকা দ্য বিউটিফুল"-এর মতো দেশাত্মবোধক গানগুলো গাওয়া ও বাজানো হয়।আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস কেবল একটি উৎসব নয়, এটি তাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বাকস্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতীক। এই দিনটি আমেরিকানদের মনে করিয়ে দেয় যে, কত বড় আত্মত্যাগের বিনিময়ে তারা আজকের এই স্বাধীন ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রটি পেয়েছে। একই সাথে এটি বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের শোষিত ও পরাধীন মানুষের কাছেও স্বাধীনতার এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস আনন্দ, উৎসব এবং গভীর জাতীয়তাবোধের এক অপূর্ব মিশ্রণ। দীর্ঘ দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আমেরিকানরা এই দিনটিকে অত্যন্ত গর্বের সাথে পালন করে আসছে, যা তাদের জাতীয় ঐক্য ও বৈচিত্র্যের মাঝে একতার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।