রাজশাহীতে সরকারি রাস্তা দখল নিয়ে সংঘর্ষ, সংবাদকর্মীসহ আহত ৩; থানায় মামলা
রাজশাহী ব্যুরো।
রাজশাহী মহানগরীর চন্দ্রিমা থানাধীন ছোটবনগ্রাম পূর্বপাড়া এলাকায় সরকারি রাস্তা দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় এক গৃহবধূ, এক সংবাদকর্মীসহ অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের সময় এক গৃহবধূর কানের স্বর্ণের দুল ছিনিয়ে নেওয়া এবং এক যুবককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে গুরুতর জখম করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মোঃ সুমন বাদী হয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে চন্দ্রিমা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।
মামলার এজাহারে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ অক্টোবর শুক্রবার সকাল আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর ছোটবনগ্রাম পূর্বপাড়া এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মামলায় অভিযুক্ত ছয়জন হলেন মোঃ মুনসুর (৪৬), গাফ্ফার (৫৬), শান্তা (২৮), আজিজুল (৪৬), শাকিলা (৩৫) ও মোঃ মাজদার (৫২)। সরকারি রাস্তার ওপর প্রাচীর নির্মাণ করে জায়গা দখল এবং এ নিয়ে বিরোধের জেরেই সংঘর্ষের সূত্রপাত বলে অভিযোগকারীর দাবি।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের বসতবাড়ির পাশের সরকারি রাস্তার ওপর প্রাচীর নির্মাণ করে জায়গাটি দখলে রেখেছিলেন। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। রাস্তার ওপর প্রাচীর নির্মাণের কারণে এলাকাবাসীকে চলাচলে ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা ও বিরোধের সৃষ্টি হলে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় একপর্যায়ে ওই প্রাচীর অপসারণ করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রাচীর অপসারণের পরও সরকারি রাস্তা দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের অবসান হয়নি। ঘটনার দিন সকালে এ বিষয়টি নিয়ে বাদী মোঃ সুমন (৩৭)-এর সঙ্গে অভিযুক্ত পক্ষের লোকজনের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে অভিযুক্তরা উত্তেজিত হয়ে সুমনকে গালাগাল করেন বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। সুমন এর প্রতিবাদ জানালে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং পরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, প্রথম অভিযুক্ত মোঃ মুনসুরের নির্দেশে তৃতীয় অভিযুক্ত শান্তা সুমনের স্ত্রী সোনিয়া খাতুন টুম্পাকে (২৮) ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেন। এরপর তৃতীয় অভিযুক্ত শান্তা ও পঞ্চম অভিযুক্ত শাকিলা মিলে টুম্পাকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ সময় তাঁর কানের একটি স্বর্ণের দুল ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলেও এজাহারে দাবি করা হয়েছে। দুলটির ওজন আনুমানিক তিন আনি এবং বাজারমূল্য প্রায় ১৬ হাজার টাকা বলে অভিযোগকারী উল্লেখ করেছেন।
এদিকে, টুম্পাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে সুজন (৩০) নামের এক যুবকের ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলার অভিযোগ ওঠে। এজাহারে বলা হয়েছে, প্রথম অভিযুক্ত তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো চাইনিজ কুড়াল দিয়ে মাথায় কোপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। সুজন আঘাত থেকে বাঁচতে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলে কোপটি তাঁর কপালে লাগে। এতে তিনি গুরুতর রক্তাক্ত জখম হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময় ষষ্ঠ অভিযুক্ত মোঃ মাজদার বাঁশের লাঠি দিয়ে সুজনকে আঘাত করেন বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্য অভিযুক্তরা প্রতিবেশী আব্দুল কুদ্দুস (৬৬)-কে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তাক্ত জখম হয় বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংঘর্ষের পর স্থানীয় বাসিন্দারা আহতদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। পরে আহত সুজন ও আব্দুল কুদ্দুসকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগ অনুযায়ী, সংঘর্ষে এক গৃহবধূ, এক যুবক এবং এক প্রবীণ প্রতিবেশী আহত হয়েছেন। একই ঘটনায় সংবাদকর্মী মোঃ সুমনও নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে উল্লেখ করে থানায় মামলা করেছেন।
ঘটনার বিষয়ে ভুক্তভোগী ও সংবাদকর্মী মোঃ সুমন বলেন, তিনি একজন সংবাদকর্মী হিসেবে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সরকারি রাস্তা দখলের বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা বিষয়টি মেনে না নিয়ে তাঁর পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধের জেরে তাঁদের ওপর নৃশংসভাবে হামলা করা হয়েছে এবং এতে তাঁর পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মামলার চতুর্থ অভিযুক্ত আজিজুল। নিজের বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, তাঁর ভাইয়ের জায়গায় একটি বাউন্ডারি ওয়াল ছিল। সুমনের পক্ষের লোকজন তাঁদের কোনো কিছু না জানিয়েই ওই দেয়াল ভেঙে ফেলেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। আজিজুলের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। পরে খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছালে উল্টো তাঁকেই মারধর করে ফেলে দেওয়া হয়। ফলে একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে চন্দ্রিমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম জানান, ঘটনার বিষয়ে থানায় লিখিত এজাহার পাওয়া গেছে। বর্তমানে বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
সরকারি রাস্তার ওপর প্রাচীর নির্মাণ ও তা অপসারণকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধ শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষে রূপ নেওয়ায় স্থানীয় এলাকায় এ ঘটনা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। রাস্তা দখলের অভিযোগ, মারধর, স্বর্ণের দুল ছিনিয়ে নেওয়া এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে জখম করার মতো গুরুতর অভিযোগগুলো এখন তদন্তের বিষয়। মামলার এজাহারে যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। এ বিষয়ে পুলিশের তদন্ত শেষে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে থানা পুলিশ।
প্রতিবেদন-সংক্রান্ত তথ্য: এ ঘটনায় বাদী মোঃ সুমন ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। তবে মামলায় উল্লিখিত অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে তাঁদের দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করা সমীচীন নয়।