একটি ম্যাচ, একটি ফল; তারপরই হয় টুর্নামেন্টে টিকে থাকার নতুন স্বপ্ন, না হয় চিরতরে বিদায়ের কান্না। ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের সমীকরণ সবসময়ই এমন নির্মম এবং রোমাঞ্চকর। সেই কঠিন এবং অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের অন্যতম ফুটবল পরাশক্তি বেলজিয়াম। একদিকে মার্কিন তরুণদের অদম্য উচ্ছ্বাস, গতিময় ফুটবল এবং ঘরের মাঠের হাজার হাজার দর্শকের আকাশচুম্বী সমর্থন; অন্যদিকে বেলজিয়ামের অভিজ্ঞতা, নিখুঁত রণকৌশল আর বড় ম্যাচে স্নায়ু ধরে রেখে নিজেদের প্রমাণ করার দীর্ঘ ইতিহাস। কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটার এই মহালড়াইয়ে দুই দলের লক্ষ্য একটাই—যেকোনো মূল্যে জয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক সিয়াটল স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল ৬টায় শুরু হবে শেষ ষোলোর এই ব্লকবাস্টার ম্যাচটি। আধুনিক অবকাঠামো, দৃষ্টিনন্দন ছাদ ও দুর্দান্ত দর্শক পরিবেশের জন্য বিশ্বজুড়ে আলাদা পরিচিতি রয়েছে এই ভেন্যুর। স্বাগতিক দল হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই গ্যালারির সিংহভাগ জুড়েই থাকবে মার্কিন সমর্থকদের গগনবিদারী গর্জন, যা ম্যাচের প্রতিটি মিনিটে বাড়তি প্রেরণা ও অক্সিজেন জোগাবে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলারদের। তবে অভিজ্ঞতায় ঠাসা বেলজিয়ামকে রুখে দেওয়া যে মোটেও সহজ হবে না, তা ভালো করেই জানে স্বাগতিকরা।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে বেলজিয়াম সবসময়ই ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী এবং সমীহ জাগানিয়া দল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের 'গোল্ডেন জেনারেশন' বা সোনালী প্রজন্মের হাত ধরে তারা বিশ্ব ফুটবলে এক অপরাজিত ও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। যদিও বড় কোনো ট্রফি এখনো তাদের শোকেসে ওঠেনি, তবে কেভিন ডি ব্রুইনা কিংবা রোমেলু লুকাকুদের মতো বিশ্বসেরা তারকাদের নিয়ে গড়া এই দল যেকোনো প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। অন্যদিকে, ফুটবল মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী ও দৃঢ় করছে। একসময় সকার বা ফুটবলকে যুক্তরাষ্ট্রে অতটা গুরুত্ব না দেওয়া হলেও, বর্তমানে তরুণ প্রতিভাদের উত্থান, ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলোতে মার্কিন ফুটবলারদের দাপট এবং আধুনিক ঘরানার ফুটবল তাদের বিশ্বমঞ্চের অন্যতম ডার্ক হর্সে পরিণত করেছে। এবার ঘরের মাঠের সুবিধা নিয়ে তারা শুধু কোয়ার্টার ফাইনাল নয়, আরও বড় কোনো রূপকথার স্বপ্ন বুনছে।
চলতি বিশ্বকাপে স্বাগতিকদের শুরুটা ছিল এককথায় দুর্দান্ত ও রাজকীয়। গ্রুপ পর্বের নিজেদের প্রথম ম্যাচেই তারা লাতিন আমেরিকার দল প্যারাগুয়েকে ৪–১ গোলের বিশাল ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে আত্মবিশ্বাসী সূচনা করে। দ্বিতীয় ম্যাচে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে ২–০ গোলে হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই নকআউটের পথ অনেকটাই মসৃণ করে ফেলে মার্কিনরা। যদিও গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তুরস্কের কাছে কিছুটা ছন্দপতন ঘটে এবং হেরে যায়, তবুও রানার্স-আপ হিসেবে তারা শক্ত অবস্থানে থেকেই পরের রাউন্ডে পা রাখে। এরপর রাউন্ড অব ৩২-এর বাঁচা-মরার লড়াইয়ে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ২–০ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করে স্বাগতিকরা। হাই-প্রেসিং ফুটবল ও উইং দিয়ে দ্রুত আক্রমণই ছিল এখন পর্যন্ত তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
অপরদিকে, রেড ডেভিলস খ্যাত বেলজিয়ামের বিশ্বকাপের যাত্রাটি মোটেও সহজ ছিল না, বরং ছিলো কাঁটা বিছানো এবং কঠিন লড়াইয়ে ভরা। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে আফ্রিকার দেশ মিশরের সঙ্গে ১–১ গোলে ড্র করে পয়েন্ট হারিয়ে আসর শুরু করে তারা। তবে দ্বিতীয় ম্যাচেই নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় ডোমেনিকো টেডেস্কোর শিষ্যরা। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ইরানের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে অপরাজিত থেকেই নকআউটে পা রাখে ইউরোপের এই পরাশক্তি। এরপর রাউন্ড অব ৩২-এ তারা মুখোমুখি হয়েছিল আফ্রিকার সিংহ সেনেগালের। সেই শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে সেনেগালকে ৩–২ গোলে হারিয়ে নিজেদের জাত চেনায় বেলজিয়াম। কঠিন পরিস্থিতিতেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে নিজেদের হাতে রাখতে হয়, সেই সামর্থ্য আরও একবার বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে তারা।
মঙ্গলবারের এই ম্যাচে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি ডাগআউট এবং তারকা ফুটবলারদের মধ্যেও চলবে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের মূল ভরসা এবং প্রাণভ্রমরা হলেন তাদের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ। এসি মিলানের এই তারকার গতি, অতিমানবীয় ড্রিবলিং এবং ফাইনাল থার্ডে সৃজনশীলতা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য সবসময়ই বড় হুমকি। মাঝমাঠে জুভেন্টাসের ওয়েস্টন ম্যাককেনি ও মোনাকোর ইউনুস মুসাহ দলের ছন্দ ধরে রাখার মূল দায়িত্ব পালন করবেন। আক্রমণে ফোলারিন বালোগুন গোলের সন্ধানে বেলজিয়ামের বক্সে ত্রাস সৃষ্টি করতে প্রস্তুত, আর ডিফেন্সে টিম রিম ও গোলপোস্টের নিচে অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ম্যাট টার্নার দলকে ভরসা জোগাচ্ছেন।
বিপরীতে বেলজিয়ামের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের অভিজ্ঞ এবং বিশ্বমানের আক্রমণভাগ। স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু ফর্মে থাকলে এবং সামান্যতম সুযোগ পেলেই ম্যাচের মোড় একাই ঘুরিয়ে দিতে পারেন। আর মাঝমাঠে ম্যানচেস্টার সিটির জাদুকর কেভিন ডি ব্রুইনার পাসিং ও সৃজনশীলতা এখনো দলের সবচেয়ে বড় এবং মারাত্মক অস্ত্র। এর সাথে যোগ হয়েছে ম্যান সিটিরই তরুণ উইঙ্গার জেরেমি ডকুর বিদ্যুতগতির দৌড় এবং লাইপজিগের লোইস ওপেন্ডার ধারালো আক্রমণ। রক্ষণে ভাউট ফায়েস এবং গোলকিপার কোয়েন কাস্তিলস বেলজিয়ামকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কোচ বেশ আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলেন, "ঘরের মাঠে হাজারো দর্শকের সামনে খেলাটা আমাদের জন্য সবসময়ই বিশেষ কিছু এবং বড় অনুপ্রেরণা। বেলজিয়াম নিঃসন্দেহে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দল, তবে আমরা আমাদের নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবলে বিশ্বাস করি এবং মাঠে সেরাটা দিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে বেলজিয়ামের কোচ প্রতিপক্ষকে সমীহ করে নিজের কৌশলের কথা জানান। তার ভাষায়, "বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কোনো ম্যাচই সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র খুবই তরুণ এবং দ্রুতগতির একটি দল, যারা কাউন্টার অ্যাটাকে মারাত্মক। আমাদের অভিজ্ঞতার পুরোটা কাজে লাগিয়ে তাদের গতির ওপর লাগাম টানতে হবে।
কৌশলগতভাবে এই মহাযুদ্ধের সবচেয়ে বড় লড়াইটি হবে মাঝমাঠে বা মিডফিল্ডে। যুক্তরাষ্ট্র চাইবে তাদের চিরচেনা উচ্চগতির প্রেসিং ও দ্রুত পালটা আক্রমণে বেলজিয়ামের ডিফেন্সকে তছনছ করতে। অন্যদিকে বেলজিয়ামের লক্ষ্য থাকবে বল পজেশন বা বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ডি ব্রুইনার নিখুঁত পাসিং এবং লুকাকুর ক্লিনিকাল ফিনিশিং কাজে লাগানো। যেহেতু দুই দলই ট্রানজিশন ফুটবলে (ডিফেন্স থেকে দ্রুত আক্রমণে যাওয়া) দারুণ দক্ষ, তাই ম্যাচটি অত্যন্ত দ্রুতগতির, আক্রমণাত্মক এবং রোমাঞ্চে ভরপুর হতে যাচ্ছে। সিয়াটলের আলোঝলমলে রাতের আকাশ সাক্ষী হতে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক ফুটবল দ্বৈরথের। স্বাগতিকদের সামনে সুযোগ ঘরের মাঠে নতুন ইতিহাস লেখার, আর বেলজিয়ামের সামনে সুযোগ বহুদিনের অপূর্ণ বিশ্বকাপ স্বপ্ন পূরণের আরও এক ধাপ কাছে যাওয়ার। শেষ বাঁশি বাজার পর কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার উল্লাসে মাতবে কারা? স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ তুর্কিরা, নাকি ইউরোপের রেড ডেভিলসরা? উত্তর মিলবে মাঠের লড়াইয়ে।