হোসেনপুরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নাগরিক ভাবনা,
তপন চন্দ্র সরকার, স্টাফ রিপোর্টার, হোসেনপুর কিশোরগঞ্জ,
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের ভাবনা। একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ওপর নির্ভর করে না। রাষ্ট্র কতটা জবাবদিহিমূলক, তার ওপরও নির্ভর করে দেশের প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে । সেই জায়গায় দুর্নীতি একটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা।
দুর্নীতি যখন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে থাকে, তখন তার ক্ষতি হয়তো একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু দুর্নীতি যখন ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে, তখন এর প্রভাব পড়ে পুরো সমাজের ওপর। একজন নাগরিক তার ন্যায্য অধিকার পেতে বাধাগ্রস্ত হন, যোগ্য ব্যক্তি তার প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, সরকারি অর্থের অপচয় হয় এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে।
আজ আমাদের সামনে শুধু একটি প্রশ্ন নয়—দুর্নীতির বিরুদ্ধে কতটি আইন আছে বা কতটি অভিযান পরিচালিত হয়েছে—তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, দুর্নীতিকে আমরা সামাজিকভাবে কতটা প্রত্যাখ্যান করতে পেরেছি?
দুর্নীতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলোর একটি হলো এর সঙ্গে সমাজের একটি অংশের ধীরে ধীরে মানিয়ে নেওয়া। ‘কাজটা দ্রুত শেষ করতে হলে কিছু দিতে হবে এভাবেই তো সবাই করে’, ‘ঘুষ না দিলে কাজ হবে না’—এ ধরনের ধারণা যখন মানুষের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়, তখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন থাকলেও এর সামাজিক ভিত্তি অটুট থাকে।
অনেক সময় একজন মানুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন, কিন্তু নিজের প্রয়োজনের সময় অনিয়মের সঙ্গে আপস করেন। কেউ ঘুষ নেওয়ার বিরোধিতা করেন, আবার অন্যদিকে নিজের পরিচিত কারও অবৈধ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে নীরব থাকেন। এই দ্বৈত মানসিকতা দুর্নীতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত সহায়ক।
অতএব দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু দুর্নীতিবাজকে চিহ্নিত করার লড়াই নয়; এটি একই সঙ্গে আমাদের সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনের লড়াই।
আইন থাকবে, কিন্তু সামাজিক প্রতিরোধও চাই
দুর্নীতি দমন করতে আইন, প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা অবশ্যই প্রয়োজন। দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু কোনো একটি প্রতিষ্ঠান একা দুর্নীতির মতো বিস্তৃত সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না।
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি নাগরিক সমাজকেও দায়িত্ব নিতে হবে। কোথাও সরকারি অর্থের অপচয় হলে প্রশ্ন করতে হবে। কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তথ্য যাচাই করতে হবে। সরকারি সেবা পেতে গিয়ে অযৌক্তিক অর্থ দাবি করা হলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে হবে। প্রয়োজন হলে তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে সরকারি কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
অবশ্যই এসব করতে হবে আইনসম্মত ও দায়িত্বশীল উপায়ে। অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তাই ব্যক্তিগত আক্রমণ বা গুজব নয়, প্রয়োজন তথ্য, প্রমাণ ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা।
সরকারি নিয়োগ, ক্রয়প্রক্রিয়া, উন্নয়ন প্রকল্প, বাজেট বরাদ্দ, টেন্ডার, সরকারি সেবা প্রদান—এসব ক্ষেত্রে যত বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যাবে, অনিয়মের সুযোগ তত কমবে।
প্রযুক্তির ব্যবহারও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নাগরিক যেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল না হন, সেজন্য সেবাগুলোকে আরও সহজ, ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা শক্তিশালী করতে হবে।
কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা মানে শুধু দুর্নীতির ঘটনা ঘটার পর শাস্তি দেওয়া নয়; এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে দুর্নীতি করার সুযোগই সীমিত হয়ে আসে।
নাগরিকের ছোট প্রতিবাদও বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে
অনেকে মনে করেন, একজন সাধারণ নাগরিকের পক্ষে দুর্নীতির মতো বড় সমস্যার বিরুদ্ধে কিছু করা সম্ভব নয়। এই ধারণা পরিবর্তন করা জরুরি।
একজন নাগরিক ঘুষ দিতে অস্বীকার করতে পারেন। সরকারি সেবার রসিদ চাইতে পারেন। কোনো উন্নয়নকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে হিসাব চাইতে পারেন। তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে তথ্য চাইতে পারেন। অনিয়মের প্রমাণ পেলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে পারেন।
এগুলো হয়তো ছোট ছোট পদক্ষেপ। কিন্তু হাজার হাজার নাগরিক যখন একইভাবে নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হলে, তখন সেটিই সামাজিক প্রতিরোধ আন্দোলনে পরিণত হতে পারে।
সমাজের বিবেকবান মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে সবার আগে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, ব্যবসায়ী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দায়িত্বশীল মানুষকে নিজ নিজ জায়গা থেকে ভূমিকা রাখতে হবে।
গণমাধ্যমকে অনুসন্ধানী ও তথ্যনির্ভর সাংবাদিকতার মাধ্যমে অনিয়ম তুলে ধরতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, সততা ও নাগরিক দায়িত্বের শিক্ষাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নাটক, গান, কবিতা ও অন্যান্য সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দুর্নীতিবিরোধী মূল্যবোধ তৈরি করতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। তবে সেখানে যাচাই ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রচার না করে তথ্যনির্ভর ও দায়িত্বশীল নাগরিক সাংবাদিকতার চর্চা করতে হবে।
সৎ মানুষকে উৎসাহ, অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হল—সৎ মানুষকে একা ফেলে রাখা যাবে না, সবাই তাকে সহযোগিতা করতে হবে।
কোনো কর্মকর্তা, শিক্ষক, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি কিংবা সাধারণ নাগরিক অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাকে সামাজিকভাবে ও নৈতিক ভাবে সমর্থন করা প্রয়োজন আমাদের সবার। অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যক্তির রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
তবে সামাজিক প্রতিরোধ কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার নাম নয়।
পরিবর্তনের শুরুটা হোক আমাদের নিজেদের দিয়ে,
দুর্নীতিমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখার আগে আমাদের নিজেদের আচরণের দিকে তাকাতে হবে। আমরা কি অন্যায় সুবিধা নিতে চাই? নিজের কাজ দ্রুত করাতে নিয়ম ভাঙতে প্রস্তুত কি না? নিজের কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য আমরা দুর্নীতির আশ্রয় নেই।ফাইল এর ভিতরে টাকা দিয়ে দ্রুত কাজ করে নিতে চাই। এইখান থেকে সবার বের হয়ে আসতে হবে। পরিচিতি বা ক্ষমতার জোরে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে চাই কি না? এসব প্রশ্নের উত্তরও দুর্নীতি বিরোধী সংগ্রামের অংশ।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে কঠিন ভাবে পালন করতে হবে, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানকে পালন করতে হবে; আর নাগরিকের দায়িত্বও নাগরিককে পালন করতে হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি সমাজ তখনই শক্তিশালী হবে, যখন অন্যায়কে মানুষ প্রশ্রয় দিবে না।প্রতিবাদ করবে এর বিরুদ্ধে, তখনই একটি সুন্দর রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে উঠবে । অন্যায়, এর বিরুদ্ধে কথা বলা প্রয়োজন।
দুর্নীতি একদিনে তৈরি হয়নি এবং শুধু একটি আইন বা একটি অভিযানের মাধ্যমে এটি নির্মূলও হবে না। এর বিরুদ্ধে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক ও নৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
আমরা যদি দুর্নীতিকে অনিবার্য বলে মেনে নিই, তাহলে দুর্নীতি আরও শক্তিশালী হবে। আর যদি প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার সিদ্ধান্ত নিই, তাহলে পরিবর্তনের পথও তৈরি হবে।
সুশাসন কোনো কাগজে লেখা প্রতিশ্রুতির নাম নয়। সুশাসন হলো এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে নাগরিক তার অধিকার পাবে, প্রতিষ্ঠান তার কাজের জন্য জবাবদিহি করবে এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে।সেই বাংলাদেশ আমরা চাই। একটি সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা গড়তে হলে সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়,সবার সহযোগিতায় একটি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে উঠবে এটাই জাতির প্রত্যাশা।