
মোহাম্মদ হানিফ ফেনী সদর প্রতিনিধি
দেশে চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে মানবাধিকার কর্মীদের আরও সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে ফেনীতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভা ও মানববন্ধনে। বুধবার সকালে ফেনী প্রেসক্লাবে অধিকার-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সভায় অংশ নিয়ে অতিথিরা মানবতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক এ কে এম আবদুর রহিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন গুমের শিকার যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান রিপন–এর মা রওশন আরা বেগম।অধিকার ফেনীর ফোকাল পার্সন সাংবাদিক নাজমুল হক শামীম–এর সঞ্চালনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানবাধিকার সংগঠক ও দৈনিক অজেয় বাংলার নির্বাহী সম্পাদক শাহজালাল ভূইয়া।সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রবিউল হক রবি, মুহাম্মদ আবু তাহের ভূইয়া, সুজন–সুশাসনের জন্য নাগরিক ফেনীর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় মহাসচিব মহি উদ্দিন খোন্দকার, জাসাস ফেনী শাখার সভাপতি সাংস্কৃতিক সংগঠক কাজি ইকবাল আহমেদ পরান এবং ফেনী বন্ধুসভার উপদেষ্টা শেখ নুর উদ্দিন চৌধুরী মামুন।এ ছাড়া বক্তব্য রাখেন সাপ্তাহিক স্বদেশপত্র সম্পাদক এন এন জীবন, দৈনিক সুপ্রভাত ফেনীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ফিরোজ আলম, ফেনী সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মনির, একতা মহিলা উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যান রোকেয়া ইসলাম, ’২৪-এর আন্দোলনের জুলাইযোদ্ধা আবুল হাসান শাহীন, গুমের শিকার রিপনের ভাই মাহফুজুর রহমান শিপুসহ আরও অনেকে।সভায় গুমের শিকার রিপনের চাচা ওহিদুর রহমান, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।ফ্যাসিস শেখ হাসিনা এবং মানবাধিকার হরণকারীদের বিচার চাই রিপনের মায়ের কান্নাজড়িত দাবি মতবিনিময় সভায় গুম হওয়া যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান রিপনের মা রওশন আরা বেগম আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,দশ বছর আগে গভীর রাতে র্যাব পরিচয়ে আমার ছেলেকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আজও তার কোনো খোঁজ নেই। আমার ছেলেসহ সব গুম হওয়া মানুষকে ফিরিয়ে দিতে হবে। ফ্যাসিস শেখ হাসিনা এবং মানবাধিকার হরণকারীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।”তার এই বক্তব্যে পুরো সভাকক্ষ মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে।সভা শেষে ফেনী প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।অধিকার-এর মূল্যায়ন: মানবাধিকার পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক অধিকার তাদের লিখিত বক্তব্যে জানায়, প্রতিবছরের মতো এবারও ১০ ডিসেম্বর সারাবিশ্বে মানবাধিকার দিবস পালিত হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এখনো গভীর সংকটপূর্ণ।প্রতিষ্ঠানটি জানায়১৯৪৮ সালের এই দিনে জাতিসংঘ সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র গ্রহণ করায় এ দিনটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস হিসেবে পালিত হয়। অথচ এমন সময়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে যখন বাংলাদেশে সদ্য সংঘটিত রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন ঘটালেও মানবাধিকার সুরক্ষার লড়াই এখনো অসম্পূর্ণ।অধিকার বলে, গণঅভ্যুত্থানের ফলে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে নির্যাতন থামেনি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ রয়ে গেছে দমনমূলক অতীতের বিচারব্যবস্থা বহাল থাকায় বহু নিরপরাধ মানুষ কারাগারে আটক কারাগারে চিকিৎসা সংকট ও নির্যাতনের অভিযোগও তুলে ধরে সংগঠনটি জানায়, অনেক বন্দি চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করছেন।নিম্ন আদালতে স্বীকারোক্তিভিত্তিক রায়, যা প্রায়ই নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা হয়, মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলেও তারা মন্তব্য করে।অগ্রগতি আছে, তবে আরও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন
অধিকার আশা প্রকাশ করে জানায়—অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অপশনাল প্রটোকল অব কনভেনশন এগেইনস্ট টর্চার (অপক্যাট) অনুস্বাক্ষর করায় বন্দিদের সুরক্ষায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।এ ছাড়া জাতিসংঘের গুম প্রতিরোধ কনভেনশন অনুস্বাক্ষর এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ–২০২৫ প্রণয়নকেও তারা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে অধ্যাদেশে মৃত্যুদণ্ড রাখার বিষয়টি বাতিল করার দাবি জানায় অধিকার।আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অধিকার উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়—পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করা দলগুলোর মধ্যে এখনো অনৈক্য বিদ্যমান রাজনৈতিক সহিংসতা অব্যাহত ইতোমধ্যে সহিংসতায় প্রাণহানী ঘটেছে নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন ও অফলাইনে সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আশানুরূপ নয় গণপিটুনির প্রবণতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে
অধিকারের মতে, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রধান শর্ত এ কারণেই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।সবার মুখে এক দাবি মানবাধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন প্রয়োজন মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেন, দেশে মানবাধিকার রক্ষার জন্য শুধু মানবাধিকার সংগঠন নয়, বরং নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষকে একতাবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে।গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র সুসংহত হবে না এমন মন্তব্যও করেন অনেক বক্তা।