এম,এ,মান্নান,স্টাফ রিপোর্টার
শহীদ শরিফ ওসমান হাদী কোনো খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন না কোনো বুদ্ধিজীবী, শিল্পী কিংবা জাতীয় পর্যায়ের পরিচিত মুখ। ইতিহাসের পাতায় তার নাম থাকার কথা ছিল না। তবু তার মৃত্যুর সংবাদে কেঁদেছে গোটা দেশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ, ব্যক্তিগত আলাপচারিতা থেকে জাতীয় আলোচনায়—তার নাম উচ্চারিত হয়েছে বেদনা, ক্ষোভ ও প্রশ্নচিহ্নের সঙ্গে। প্রশ্ন জাগে—এমন একজন “সাধারণ” মানুষের মৃত্যু কেন একটি জাতির হৃদয়কে এত গভীরভাবে নাড়া দিল?এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের তাকাতে হয় সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের মনস্তত্ত্বের গভীরে।
সাধারণ মানুষের অসাধারণ প্রতীক হয়ে ওঠা শরিফ ওসমান হাদী ছিলেন এই দেশের কোটি সাধারণ মানুষের একজন প্রতিনিধি। তার জীবন ছিল না আলোঝলমলে, তার পরিচয় ছিল না ক্ষমতার বলয়ে আবদ্ধ। ঠিক এই সাধারণত্বই তাকে অসাধারণ করে তুলেছে। মানুষ তার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে—একজন ভাই, বন্ধু, সন্তান কিংবা প্রতিবেশী হিসেবে।যখন কোনো “বড় মানুষ” মারা যায়, তখন আমরা শোকাহত হই সম্মানের কারণে। কিন্তু যখন একজন সাধারণ মানুষ নির্মমভাবে মারা যায়, তখন আমরা ভেঙে পড়ি ভয়ের কারণে কারণ সেই মৃত্যু আমাদের নিজেদের জীবনের সম্ভাব্য পরিণতিকে সামনে এনে দাঁড় করায়।অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব আর্তনাদ তার মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যর্থতার এক নগ্ন প্রকাশ। মানুষ কেঁদেছে কারণ তারা বুঝেছে এই মৃত্যু এড়ানো যেত। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং অবহেলা, অন্যায় কিংবা নিষ্ঠুরতার ফল।এই কান্না আসলে ছিল একটি নীরব প্রশ্ন এই দেশে একজন সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য কতটুকু?ন্যায়বিচার কি সত্যিই সবার জন্য সমান?শরিফ ওসমান হাদীর মৃত্যু সেই প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।“সে আমি হতে পারতাম” আত্মপরিচয়ের যন্ত্রণা মানুষ তার মৃত্যুর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়েছে কারণ তারা নিজেদের তার জায়গায় কল্পনা করতে পেরেছে। এই জায়গাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় কোনো ব্যক্তিত্বের মৃত্যু আমাদের শোকাহত করে, কিন্তু দূরত্ব তৈরি করে। আর একজন সাধারণ মানুষের মৃত্যু সেই দূরত্ব ভেঙে দেয়।মানুষ ভেবেছে আমি যদি ওই জায়গায় থাকতাম?আমার পরিবারের কেউ যদি এমন পরিণতির শিকার হতো?এই ভাবনাই গোটা জাতিকে মানসিকভাবে এক সুতোয় বেঁধেছে।শহীদ হওয়া মানে শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়।আমরা প্রায়ই শহীদ শব্দটিকে যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু শহীদ শরিফ ওসমান হাদীর মৃত্যু আমাদের শিখিয়েছে শহীদ হওয়া মানে কেবল বন্দুকের গুলিতে পড়ে যাওয়া নয়; অন্যায়ের শিকার হয়ে জীবন দেওয়াও শহীদ হওয়া।তিনি লড়াই করেননি অস্ত্র হাতে, কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের বিবেকের বিরুদ্ধে এক নীরব যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাই মানুষ তাকে শহীদ হিসেবে গ্রহণ করেছে—কারণ তার রক্তের দাগে লেগে আছে সমাজের অসংখ্য প্রশ্ন।ইতিহাস বলে বড় পরিবর্তন আসে ছোট নাম থেকে ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক সময় জাতির মোড় ঘুরে যায় এমন সব মানুষের মৃত্যু থেকে, যাদের নাম আগে কেউ জানত না। শরিফ ওসমান হাদী হয়তো তেমনই একটি নাম—যিনি নিজের অজান্তেই একটি জাতির বিবেককে জাগিয়ে তুলেছেন।মানুষ কেঁদেছে কারণ তারা জানে, এই কান্না বৃথা গেলে ভবিষ্যতে আরও অনেক শরিফ ওসমান হাদী হারিয়ে যাবে।শহীদ শরিফ ওসমান হাদী বড় ব্যক্তিত্ব ছিলেন না কিন্তু তার মৃত্যু একটি বড় আয়না। সেই আয়নায় আমরা দেখেছি আমাদের সমাজের নিষ্ঠুরতা, রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা এবং নিজেদের অসহায়ত্ব।মানুষ কেঁদেছে তার জন্য নয় শুধু,কেঁদেছে নিজেদের জন্য,কেঁদেছে একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার বেদনায়।আর তাই, শরিফ ওসমান হাদী বেঁচে থাকবেন ইতিহাসে কোনো পদবির কারণে নয়,বরং একটি জাতির চোখের জলে ভিজে থাকা এক নাম হিসেবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ খায়রুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: উত্তর আব্দুল্লাহপুর কোটবাড়ি ফায়দাবাদ ঢাকা।
মোবাইল: 01968525877
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ২০২৬