
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া : এক সংগ্রামমুখর, বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অবসান (১৯৪৫ – ২০২৫)।
জাহাঙ্গীর আলম স্টাফ রিপোর্টার মানিকগঞ্জ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য নাম—দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যিনি ছিলেন আপসহীন এক নেতৃত্বের প্রতীক। তাঁর জীবন ছিল সাহস, ত্যাগ ও অবিচলতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে এক গভীর জাতীয় শোক ও সংকটের মধ্য দিয়ে। ১৯৮১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তিনি রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। সেই সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল অস্থিরতা ও স্বৈরশাসনের ছায়ায় আচ্ছন্ন।
১৯৮২ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর নেতৃত্বগুণ, দৃঢ়তা ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে দলীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন—যা ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। ১৯৯০ সালে তিনি গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং এর ফলশ্রুতিতে স্বৈরশাসনের পতন ঘটে। আপসহীন অবস্থান ও দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে তিনি পরিচিতি লাভ করেন “আপসহীন নেত্রী” হিসেবে।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি শুধু দেশের ইতিহাসেই নয়, মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেন—তিনি মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী।
পরবর্তীতে তিনি আরও দুইবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন—১৯৯৬ ও ২০০১ সালে। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ অর্থনীতি, শিক্ষা, অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করে। বিশেষ করে ২০০১–২০০৬ সময়কালকে বিএনপির সমর্থকরা উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার সময় হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল কেবল সাফল্যে ভরা নয়; ছিল বহু উত্থান-পতন, দমন-পীড়ন ও কারাবরণের কঠিন অধ্যায়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁকে একাধিকবার কারাগারে যেতে হয়েছে। দীর্ঘদিন তিনি অসুস্থতা নিয়েও রাজপথ ও রাজনীতিতে অবিচল থেকেছেন।
২৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে গুরুতর অসুস্থ হয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ভোর ছয়টায় তিনি ইন্তেকাল করেন।
ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে জাতি হারালো এক দৃঢ়চেতা রাজনৈতিক নেত্রীকে, আর বাংলাদেশ হারালো গণতন্ত্রের এক অকুতোভয় সৈনিককে।
তাঁর মৃত্যুতে দেশজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বস্তরের মানুষ তাঁর অবদান স্মরণ করছে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।
আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার, দলীয় নেতাকর্মী ও দেশবাসীর প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।
আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন—আমিন।