
মোহাম্মদ হানিফ ফেনী জেলা প্রতিনিধি
মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর প্রজন্মের কণ্ঠস্বর, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মঞ্জুকে ঘিরে নতুন রাজনীতি ও জুলাই আকাঙ্ক্ষার সমীকরণ ফেনী-২ সংসদীয় আসনে ১১ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)-এর চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জু। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, গণমাধ্যম নেতৃত্ব এবং নতুন ধারার রাজনীতির প্রতিশ্রুতি নিয়ে তিনি এই নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন।মজিবুর রহমান মঞ্জু ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের নন্দনকাননে জন্মগ্রহণ করেন যে দিনটি বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয়ের প্রতীক। তাঁর পিতা কোব্বাদুর রহমান ভূঁইয়া ছিলেন একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সংগঠক, যিনি পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হন।
সেই পারিবারিক ইতিহাস থেকেই মঞ্জুর রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানের ভিত্তি গড়ে ওঠে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।মঞ্জু ১৯৮৮ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ইসলামী ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ২০০৩ সালে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।পরবর্তীতে তিনি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে সক্রিয় হন। একই সঙ্গে গণমাধ্যম জগতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে দিগন্ত টিভির প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ২০১৩ সালে বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকায় তিনি দীর্ঘ সময় সরাসরি সম্মুখ রাজনীতিতে তুলনামূলক কম সক্রিয় ছিলেন।তার রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার নির্যাতনের শিকার হন। বিশেষ করে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় তাকে গুরুতরভাবে আহত করে মৃত ভেবে রাস্তায় ফেলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাসে একটি আলোচিত ঘটনা।২০২০ সালে জামায়াতে ইসলামীর কিছু সংস্কারপন্থী নেতার সঙ্গে মিলে মজিবুর রহমান মঞ্জু প্রতিষ্ঠা করেন আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।দলটির মূল দর্শন সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এবি পার্টি নিজেদের ইনক্লুসিভ রাজনীতির প্রবক্তা হিসেবে পরিচয় দেয়, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসার রাজনীতি থাকবে না।দল গঠনের আগে এবি পার্টির উদ্যোক্তারা বিভিন্ন দেশের ইনক্লুসিভ রাজনৈতিক মডেল নিয়ে গবেষণা করেন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ভ্রমণ করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ গ্রহণ করেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তরুণ ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে দলটি আত্মপ্রকাশ করে।জাতীয় রাজনীতিতে মজিবুর রহমান মঞ্জু ডান-বাম নির্বিশেষে একটি গ্রহণযোগ্য ও আন্তরিক নাম হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভিন্ন মত ও ভিন্ন ধারার রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সংলাপ ও সহাবস্থানের সক্ষমতাই তাকে আলাদা করে তোলে।২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে তিনি ও তার সহকর্মীরা অগ্রসর ভূমিকা পালন করেন বলে দলীয় সূত্র দাবি করে। আন্দোলনের কর্মীদের দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং দমন-পীড়নের মুখে তাদের সুরক্ষায় সক্রিয় ছিলেন তিনি। জুলাই পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে তার ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, বর্তমান মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর এবি পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেন, দলীয় নীতির সঙ্গে দ্বিমতের কারণেই তিনি বহিষ্কৃত হন। তবে পরবর্তীকালে জামায়াত যে সংস্কার ও ইনক্লুসিভ রাজনীতির পথে অগ্রসর হয়, তা মঞ্জুর বহিষ্কারের সময় কল্পনাতীত ছিল বলেও তারা মনে করেন।রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের ভাষায়, সংকটময় ঐতিহাসিক মুহূর্ত বা Critical Juncture–এই নতুন রাজনৈতিক পথের জন্ম হয়। সেই বাস্তবতায় মজিবুর রহমান মঞ্জু পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে নতুন রাজনীতির পথে হাঁটেন বলে দাবি এবি পার্টির নেতাদের।এই নির্বাচন এবি পার্টির প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলে দলটি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন, কৌতূহল ও প্রত্যাশা সবই রয়েছে। আধিপত্যবাদ বিরোধী অবস্থান এবং জুলাই আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে এবি পার্টি এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে অংশ নিচ্ছে।ফেনী-২ আসনে এবি পার্টি ও ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা বলছেন, কল্যাণ রাষ্ট্র ও ইনক্লুসিভ রাজনীতির স্বপ্ন বাস্তবায়নে ঈগল মার্কায় ভোট দিয়ে মজিবুর রহমান মঞ্জুকে বিজয়ী করার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা।