
বিশেষ প্রতিবেদন
ডিজিটাল মানব হওয়ার দৌড়ে আমরা এখন আর শুধু মানুষ নই, আমরা একেকজন ‘কনটেন্ট’। আমাদের এই কনটেন্ট হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী ক্ষেত্র হলো ফেসবুক। একসময় যাকে ‘ভার্চুয়াল স্পেস’ বলা হতো, আজ তা এতটাই বাস্তব যে ব্যক্তিগত আর সামাজিক জীবনের সীমানা প্রায় মুছে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি ফেসবুক ব্যবহার করছি, নাকি ফেসবুক আমাদের ব্যবহার করছে?
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সকালটা শুরু হয় আয়নায় মুখ দেখে নয়, বরং ফেসবুকের নিউজফিড দেখে। কে কী খেল, কোথায় গেল কিংবা কার সংসারে কী সমস্যা—সবই এখন ‘পাবলিক নলেজ’। ব্যক্তিগত দুঃখ একসময় চার দেয়ালের ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা স্ট্যাটাস হয়ে নিউজফিডে ঝুলে থাকে। লাইক আর সমবেদনার কমেন্ট না পেলে যেন সেই দুঃখের আর কোনো ‘সামাজিক বৈধতা’ থাকে না। ঠিক একইভাবে আনন্দ, বিয়ে বা উৎসবের পূর্ণতা যেন নির্ভর করছে ফেসবুকের রিঅ্যাকশন সংখ্যার ওপর।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ফেসবুক এখন নিছক যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি হয়ে উঠেছে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক আদালত। পাঁচ বছর আগের কোনো মন্তব্য বা একটি ঝাপসা স্ক্রিনশট দিয়ে মুহূর্তেই কাউকে দেশপ্রেমিক বা দেশদ্রোহী তকমা দেওয়া হচ্ছে। আমরা নিজেরাই এই বিচার ব্যবস্থার স্বেচ্ছাসেবী বিচারক হয়ে গেছি।
বাস্তব জীবনে মানুষের কাজ বা অবদান এখন গৌণ। কারো পূর্ণাঙ্গ ‘সিভি’ এখন তার ফেসবুক স্ট্যাটাস। সকালে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আমরা মানুষের চরিত্র বিশ্লেষণ করে ফেলি। সমাজে তৈরি হয়েছে এক ভয়াবহ ‘ডিজিটাল লেবেলিং কালচার’, যেখানে মানুষকে বোঝার চেয়ে গায়ে ট্যাগ লাগানোই এখন সহজতম কাজ।
ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোকে লাইক-শেয়ারের মাপকাঠিতে বিচার করার এই প্রবণতা আমাদের সুস্থ সামাজিক কাঠামোকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। ফেসবুক যেন আমাদের জীবনের বিচারক না হয়ে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেই থাকে, সেই সচেতনতা এখন জরুরি।