
নয়ন ফারাজী উলিপুর
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় চলতি আমন মৌসুমে সরকারি মূল্যে চাল সংগ্রহ কার্যক্রমকে ঘিরে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা খাদ্য বিভাগ, কয়েকজন চাতাল-মিল মালিক এবং একটি প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মিল সংশ্লিষ্টরা।
কোনো ধরনের সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ, সম্পূর্ণ অচল এমনকি অস্তিত্বহীন হাসকিং চাতাল ও রাইস মিলের নামেও বিপুল পরিমাণ সিদ্ধ চাল সংগ্রহের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটি সরকারি খাদ্য সংগ্রহ নীতিমালার সরাসরি ও মারাত্মক লঙ্ঘন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের আমন মৌসুমে উলিপুর উপজেলা খাদ্য গুদামে মিলারদের মাদ্যমে ৫৮৫.৯৯০ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। গত ৯ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম চলবে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে উপজেলা খাদ্য বিভাগ ৪৮টি হাসকিং চাতাল ও রাইস মিলকে সচল দেখিয়ে একটি বরাদ্দ তালিকা প্রস্তুত করে। তালিকা অনুযায়ী প্রতিটি মিলকে পরীক্ষিত ক্ষমতার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১৮.৪২০ মেট্রিক টন এবং সর্বনিম্ন ৭.৭৭০ মেট্রিক টন করে সিদ্ধ চাল সরবরাহের চুক্তি দেওয়া হয়।
তবে সরেজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। তালিকাভুক্ত ৪৮টি মিলের মধ্যে মেসার্স উৎপল চালকল, মেসার্স পান্ডে চালকল,মেসার্স ইসলাম চালকল,মেসার্স রাজা ট্রেডার্স চালকল, মেসার্স মারুফা চালকল, মেসার্স বিজু চালকল,মেসার্স অরজিৎ চালকল,মেসার্স বিলকিস চালকল,মেসার্স সাজেদুর চালক।
সহ প্রায় ৪০টি চালকল ঘুরে দেখা যায়, এসব মিলের চাতাল, হাউস ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো চালকল কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে না। অধিকাংশ মিলই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। কোথাও মিলের কোনো অস্তিত্ব নেই, আবার কোথাও ঝোপঝাড়ে ঢাকা পরিত্যক্ত ভবন পড়ে আছে। অনেক জায়গায় হাসকিং বয়লার তো দূরের কথা, মিলের স্থানে খড়ের পালা বা কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে এসব চাতালে কোনো উৎপাদন কার্যক্রম নেই।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মিল সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বন্ধ ও অস্তিত্বহীন পরিত্যক্ত চাতাল মিলগুলোর নাম ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বাইরে থেকে নিম্নমানের চাল সংগ্রহ করে সরকারি খাদ্য গুদামে সরবরাহ করছে। এতে সরকার যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি প্রকৃত সচল মিল ও সৎ মিলাররা ন্যায্য বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
খাদ্য গুদাম সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে ৫৭৪.৬২০ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ সম্পন্ন হয়েছে। তবে সংগৃহীত চালের একটি বড় অংশের মান নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চালকল মালিক জানান, বরাদ্দের পরিমাণ এতই কম ছিল যে চাতাল- মিল চালানো সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে তিনি তার বরাদ্দ অন্যের কাছে বিক্রি করে দেন। তার অভিযোগ, এসব বরাদ্দ টিসিএফ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা জেলা পর্যায়ে বসেই নির্ধারণ করেন।
অন্যদিকে এক প্রাক্তন চালকল মালিক বলেন, সরকারি বরাদ্দ না পাওয়া চাল ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। নিম্নমানের চাল প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করে বলেন,
খাদ্য গুদামে টাকার বিনিময়ে সব ধরনের চালই গ্রহণ করা হয়। টাকা থাকলে চাল সদৃশ যেকোনো কিছুই নেওয়া হয়,ভালো বা নিম্নমান, কোনো যাচাই-বাছাই করা হয় না।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত সচল মিলগুলোকে যাচাই করে নতুন করে বরাদ্দ নির্ধারণ এবং সচল মিল-চাতাল থেকে সরকারি চাল সংগ্রহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মিসবাহুল হোসাইনের কাছে ৪৮টি তালিকাভুক্ত চাতাল মিলের বরাদ্দ সংক্রান্ত তথ্য জানতে চাইলে তিনি জানান, তালিকাভুক্ত মিল মালিকদের অনুকূলে মোট ৫৮৬.৯৯০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন সচল চাতাল মিল যাচাই-বাছাই করেই এসব মিল তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে সরেজমিনে গিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে কি না এবং তালিকাভুক্ত চাতাল মিলগুলো বাস্তবে সচল না অচল,এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সুস্পষ্ট বা সদুত্তর দেননি।
এ প্রসঙ্গে কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ কাজী হামিদুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে পরিত্যক্ত চালকলগুলোর বরাদ্দ সরেজমিনে পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাই না করেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এমন প্রশ্নের জবাব তিনি বলেন আপনি বললেই তো হবে না, বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখব।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহামুদুল হাসান বলেন বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি পরবর্তীতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে ফুড অফিসারকে সতর্ক করা হয়েছে।