
ইতিহাস গড়েছে লক্ষ্মীপুরের মেয়ে নাজমুন নাহার সোহগী
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : মোঃ রাকিব হোসেন (বিশেষ প্রতিবেদন)
প্রথম বাংলাদেশি ও মুসলিম নারী হিসেবে বিশ্বের ১৮৪টি দেশ ভ্রমণ করে বিরল এক ইতিহাস গড়েছেন বিশ্বপরিব্রাজক নাজমুন নাহার। সর্বশেষ ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র বাহামা সফরের মাধ্যমে তিনি এই অনন্য মাইলফলকে পৌঁছান। তার এই অসাধারণ অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে বাহামার ফার্স্ট লেডি প্যাট্রিসিয়া মিনিস তাকে অভিনন্দন জানান।
গত বছরের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালে নাজমুন নাহার একটানা বিভিন্ন মহাদেশ ও অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। এ সময় তিনি ওশেনিয়া অঞ্চলের সামোয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তিমুর-লেস্তে, ক্যারিবীয় অঞ্চলের অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা এবং সেন্ট কিটস ও নেভিস, দক্ষিণ আমেরিকার ভেনিজুয়েলা ও ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র বাহামা সফর করেন।
২০০০ সালে ভারতের একটি আন্তর্জাতিক অভিযাত্রা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নাজমুন নাহারের বিশ্বভ্রমণ শুরু হয়। একক ভ্রমণকারী হিসেবে তিনি প্রধানত সড়কপথে বিভিন্ন দেশ অতিক্রম করেছেন। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে তাকে নানা বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবুও অদম্য সাহস ও দৃঢ় মনোবলের মাধ্যমে তিনি তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। এখনো যেসব দেশ ভ্রমণ বাকি রয়েছে, সেগুলো ঘুরে দেখার পরিকল্পনাও রয়েছে তার।
নাজমুন নাহারের এই অর্জন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভেনিজুয়েলা, ক্যারিবীয় অঞ্চল, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক গণমাধ্যমে তার ভ্রমণ ও সাফল্যের খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনেও তাকে নিয়ে ফিচার প্রকাশ পেয়েছে।
বিশ্বভ্রমণের পাশাপাশি নাজমুন নাহার শান্তি প্রতিষ্ঠা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধসহ বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক বার্তা ছড়িয়ে দিতে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিটি দেশে তিনি বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা বহন করে দেশের সংস্কৃতি ও পরিচিতি তুলে ধরছেন।
ভেনিজুয়েলা সফর প্রসঙ্গে নাজমুন নাহার বলেন, এটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে তিনি দেশটির ১৭টি শহর ঘুরে দেখেন। আন্দিজ পর্বতমালা, সবুজ উপত্যকা, সমুদ্র, মরুভূমি এবং স্থানীয় মানুষের আতিথেয়তায় ভেনিজুয়েলাকে তিনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য মেলবন্ধন হিসেবে দেখেছেন।
এর আগে ২০১৮ সালে জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ে ভ্রমণের মাধ্যমে তিনি ১০০তম দেশ সফরের মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন। ২০২১ সালে সাও টোমে ভ্রমণের মধ্য দিয়ে ১৫০তম দেশ এবং ২০২৪ সালে প্রিন্সিপে সফরের মাধ্যমে ১৭৫তম দেশ ভ্রমণ সম্পন্ন করেন। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাহামা সফরের মাধ্যমে ১৮৪টি দেশ ভ্রমণের ঐতিহাসিক অর্জন পূর্ণ হয়।
নাজমুন নাহার ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পিস টর্চ বেয়ারার অ্যাওয়ার্ড, যুক্তরাজ্যের উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট অ্যাওয়ার্ডসহ অর্ধশতাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
তিনি বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এশিয়ান স্টাডিজ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এশিয়া’ বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন।
বর্তমানে তিনি গবেষক, মোটিভেশনাল স্পিকার ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করছেন। বিশ্বজুড়ে শিশু ও তরুণদের স্বপ্ন দেখতে এবং সীমাবদ্ধতা ভেঙে সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করাই তার লক্ষ্য।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে বিশ্বভ্রমণের মাধ্যমে নাজমুন নাহার আগামী প্রজন্মের জন্য সাহস, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।