
ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন মিজানুর রহমান মিনু
দীর্ঘ দুই দশক পর রাজশাহী পেল পূর্ণমন্ত্রী, নগরজুড়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাস
অপু দাস, ব্যুরো প্রধান
রাজশাহী।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভায় ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ মিজানুর রহমান মিনু। নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ায় রাজশাহীর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন পর রাজশাহী থেকে একজন পূর্ণমন্ত্রী দায়িত্ব পাওয়ায় নগরবাসীর মধ্যেও দেখা দিয়েছে বাড়তি প্রত্যাশা।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে তার নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। একই দিনে সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিকেল ৪টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি মন্ত্রিপরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। শপথ অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের একাধিক নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দুই দশক পর রাজশাহীর কোনো এমপি পেল পূর্ণমন্ত্রী পদ
এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর পর রাজশাহীর কোনো সংসদ সদস্য পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হলেন। এর আগে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আমিনুল হক ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ টানা চারবার ক্ষমতায় থাকলেও রাজশাহী জেলার ৬টি সংসদীয় আসনের কোনো সদস্যকে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তবে এ সময় রাজশাহী থেকে একজন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। শাহরিয়ার আলম পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজশাহীর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এবার পূর্ণমন্ত্রী পাওয়ার মাধ্যমে রাজশাহী আবারও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বের জায়গায় উঠে এসেছে।
রাজশাহী-২ আসনে বড় ব্যবধানে জয়, দ্বিতীয়বার সংসদে
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-২ (সদর) আসনে বিপুল ভোটে জয়ী হন মিজানুর রহমান মিনু। নির্বাচনে তিনি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে ২৮ হাজার ১৭৬ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন।
এটি মিনুর সংসদীয় রাজনীতিতে দ্বিতীয় জয়। এর আগে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় পর আবার সংসদে ফিরে এসে এবার তিনি মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলেন।
মেয়র হিসেবে রাজশাহী নগর পরিচালনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা
মিজানুর রহমান মিনুর রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে স্থানীয় সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা। তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত প্রথম দফায় রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৯৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত একটানা দীর্ঘ সময় তিনি মেয়র ছিলেন।
এই সময় রাজশাহীর অবকাঠামো উন্নয়ন, নগর ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং সবুজ নগরী গড়ে তোলার নানা উদ্যোগের সঙ্গে তার নাম যুক্ত ছিল। নগরবাসীর একটি অংশ মনে করে, রাজশাহীকে আধুনিক নগরী হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে মিনুর অবদান উল্লেখযোগ্য।
ছাত্রদল থেকে উঠে এসে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে
ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে উঠে আসা মিনু বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতেও দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তিনি সাংগঠনিক সম্পাদক এবং পরে যুগ্ম মহাসচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও ছিলেন।
এছাড়াও তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে কাজ করার অভ্যাসই তাকে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভূমিমন্ত্রী ঘোষণার পর রাজশাহীতে মিছিল-উৎসব
ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই রাজশাহীতে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীরা এটিকে রাজশাহীর জন্য বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন। খবরটি পাওয়ার পরপরই রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটনের নেতৃত্বে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আনন্দ মিছিল বের করা হয়।
মিছিলে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্লোগানে রাজপথ মুখরিত করে তোলেন। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। নগরের একাধিক স্থানে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা পৃথকভাবেও আনন্দ প্রকাশ করেন।
ভূমি ব্যবস্থাপনায় বরেন্দ্র অঞ্চলে বড় প্রত্যাশা
রাজশাহীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূমি সংক্রান্ত সমস্যা দীর্ঘদিনের। জমির নামজারি, রেকর্ড সংশোধন, জমি দখল, খাস জমি ব্যবস্থাপনা, ভূমি অফিসের সেবা সহজীকরণ, অনলাইন রেকর্ড ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ নানা বিষয়কে ঘিরে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি রয়েছে।
দলীয় নেতারা মনে করছেন, মিনুর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং জনপ্রিয়তাকে মূল্যায়ন করেই তাকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে তারা আশা করছেন।
রাজশাহীর রাজনীতিতে নতুন বার্তা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিনুকে ভূমিমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত রাজশাহীর রাজনীতিতে একটি নতুন বার্তা দিয়েছে। দীর্ঘদিন পর রাজশাহী থেকে পূর্ণমন্ত্রী হওয়ায় জেলার উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সুবিধা বৃদ্ধির প্রত্যাশা বেড়েছে।
অনেকেই মনে করছেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের মতো সংবেদনশীল ও জনসম্পৃক্ত মন্ত্রণালয়ে মিনুর কার্যকর উদ্যোগ রাজশাহীর পাশাপাশি সারাদেশের মানুষের ভূমিসেবা প্রাপ্তি আরও সহজ করতে পারে।