বিরহী কবি মাজেদুল হকের সাহিত্যালোচনা
মাজেদুল হক (জন্ম- ৩ জুলাই ১৯৭৭) খ্রিস্টাব্দ।
পূর্ণ নাম - শেখ মোহাম্মদ মাজেদুল হক বা এস এম মাজেদুল হক ওরফে মাজেদ, সাহিত্যাঙ্গণে সুপরিচিত নাম - মাজেদুল হক " বিরহী কবি " হিসেবে সমধিক খ্যাত ও সমাদৃত।
কবি মাজেদুল হক বৃহত্তর ময়মনসিংহে নেত্রকোণা জেলার সদর উপজেলায় পাটলী গ্রামে ৩ জুলাই ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দ এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা- এস এম কিতাব আলী, মাতা- বেগম আয়েশা খাতুন। পড়াশোনা- বি,এ। পেশা- এল এফ এফ (লাইভষ্টক ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর) প্রাণিসম্পদ দপ্তর।
বর্তমান সময়ের উদীয়মান কবিদের সাহিত্য কারুকার্য নিয়ে আলোচনা করিলে যে ক'জনের নাম তালিকায় আসিবে, সেই তালিকায় কবি মাজেদুল হকের নাম স্থান পাবে প্রথম সারিতে। কবি মাজেদুল হকের সাহিত্য বিশ্লেষণ করিলেই আলোচনায় বেড়িয়ে আসে সাহিত্যের কারুকার্য।
বিভিন্ন কবিগণ কবিতা কে বিভিন্ন ভাবে, নিজস্ব মতে সংজ্ঞায়িত করেছেন কিন্তু কবি মাজেদুল হকের কবিতার ব্যাখ্যাও সূক্ষ্ম ও বিশ্লেষণাত্মক। তিনি বলেছেন-
"কবিতা,
ক--বি--তা--;
কবি বিবেক তাপস,
জীবন প্রেম যশ।"
উপরিউক্ত চরণগুলোর আলোকে কবি বুঝাতে চেয়েছেন- একজন কবি ,কবির চিন্তাশীল বিবেক এবং কবির সাধনাসুলভ তাপস বা তপসা যার সাথে যুক্ত হয়েছে একটি জীবন। তার মানে কবিতায় থাকে একটি জীবনের কথা, থাকে মানবপ্রীতি কিংবা প্রকৃতি, বস্তু ইত্যাদির প্রতি প্রেম। আরও আছে যশ অর্থাৎ কবির কবিতা লেখার পারদর্শীতা বা খ্যাতি (সূত্রঃ মাজেদুল হকের সাথে ব্যাক্তিগত সাক্ষাতকার)।
একটি দেশের সংবিধানে যেমন নাগরিকের মত প্রকাশের অধিকার স্বীকৃত, কবিতার ব্যাকরণেও কবি ও কবিতাকে সংজ্ঞায়িতকরণে কবির নিজস্ব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের অধিকার স্বীকার্য। কবি মাজেদুল হক সেই মত প্রকাশের স্বাধীনতার চর্চাটিই উপরিউক্ত চরণগুলোয় হয়তো করেছেন। তাই বলে কবিতার সুন্দর বিশ্লেষণ করলেই কেউ কবি নয়, বরং তার জন্য তিনি হবেন কবিতার শুধুই একজন বিশ্লেষক কিংবা সমালোচক।
কবির কাছে কবিতা শুধু এক লোকশিল্প নয়। কিংবা লোকশিল্পকে রসমণ্ডিত করে পরিবেশনও কবিতা নয়। কবিতা মানেই শুধু সমাজকে, সভ্যতাকে ভেঙে সাজাবার কোনো ছান্দসিক বিদ্রোহও নয়। সাহিত্যে সত্যানুসন্ধ্যানও যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ "সত্য কাব্যের লক্ষ্য নয়, কাব্যের উপাদান মাত্র"। কবির সাধক মননে জমে থাকা ও সেখানে নিরবে সযতনে বাস করা কষ্টের কথা ছন্দে ছন্দে প্রকাশের নামও কবিতা। এবং কবি সেই, যার "হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা রয়েছে..." ।
মাজেদুল হক তেমনই একজন লেখক যার ভেতরে কল্পনা বিরাজ করে এবং তাঁর কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তাও রয়েছে বলেই জীবনের অতীত ও বর্তমানের অভিজ্ঞতালব্দ নব নব কাব্য বিকিরণ তাকে কবিতা লিখতে সাহায্য করেছে। সুতরাং শেষোক্ত সংজ্ঞাগুলোর বিচারে মাজেদুল হক একজন কবি তাতে সন্দেহ নেই। কেননা জীবনের অভিজ্ঞতালব্দ কষ্টের কথা ছন্দে ছন্দে বলতে গিয়ে মাজেদুল হকের বিরহী আত্মার আর্তনাদ থেকে সৃষ্ট চোখের জল যেন নদীর জলের মতই বহমান হয়েছে। সেজন্যই কবি মাজেদুল হককে 'বিরহী কবি' উপাধিতে ভূষিত করেছেন বরেণ্য সাহিত্যিকগণ।
কবি মাজেদুল হকের সাহিত্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পাঠপ্রতিক্রিয়ায় বলেছেন-
সাধক প্রাণে নীরব সযতনে যদি কষ্টের প্রকাশ,
তবে তো তিনিই " বিরহী কবি " জগতে প্রকাশ।
- অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার
কবি ও কথা সাহিত্যিক
মাজেদুল হক কে আমি ও আমার সংগঠনের পক্ষ থেকে " বিরহী কবি " উপাধিতে ভূষিত করলাম, তাঁর সাহিত্য চিন্তার আলোকে "বিরহী কবি " উপাধি যথার্ত বলে আমি মনে করি।
-অধ্যাপক নজরুল ইসলাম হাবিবী
কলম একাডেমি লন্ডন ও কলম টিভি'র প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক।
মাজেদুল হক বাংলা সাহিত্যের একজন সার্থক কবি, কবি মাজেদুল হককে " বিরহী কবি " উপাধিতে বিশেষায়িত করে আমি আত্মতৃপ্ত হতে চাই।
-প্রভাষক তিতাস আহমেদ(তিতাস মিয়া)
নেত্রকোণা সরকারী কলেজ, নেত্রকোণা।
মাজেদুল হক একজন অভিজ্ঞ ছান্দসিক কবি, প্রথাগত ছন্দের কবিতা লিখার পাশাপাশি তিনি কিছু নতুন ছন্দকাঠামো তৈরি করেছেন,তিনি তাঁর ছন্দরীতি কবিতায় ছন্দ সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করেছেন। তাহার কবিতা পড়লেই বুঝা যায়-
আগে তুমি শিখে লও প্রথাগত নীতি,
পরে কবি সৃষ্টি করো নব ছন্দরীতি।
স্বরবৃত্ত মাত্রাবৃত্ত অক্ষরবৃত্তটি,
লিখিবে শুদ্ধ কবিতা না করিবে ত্রুটি।
মুক্তক অতিমুক্তক অমিত্রাক্ষর কি ?
গৈরিশ ও গদ্যছন্দ মাত্রা বুঝে লিখি।
অমিল সমিল সবি অন্তমিলে খুঁজে,
মাত্রা হিসেব করিয়া নিতে হবে বুঝে।
ছন্দের নিয়মে আছে খুঁটিনাটি যত,
ব্যাকরণ জেনে বুঝে করিবে আয়ত্ত।
না বুঝে করিলে কিছু ফলাফল মন্দ,
কবিতায় প্রয়োজন শিল্পগুণে ছন্দ।
ছন্দরীতি কবিগণ করে যত সৃষ্টি,
প্রতিভায় যোগ হবে প্রসন্ন সুদৃষ্টি।
( 'ছন্দরীতি' কবিতা )
বিরহী কবির হৃদয়ে ভালোবাসা আছে বলেই কবির নদী, প্রকৃতি, বর্গাচাষী কিংবা প্রতিবন্ধীদের প্রতি অসীম সহানুভূতি। তিনি তার 'সহানুভূতি' নামক কবিতায় সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতি সাধারণ মানুষের অবহেলাকে দূরে ঠেলে সাম্য ও ভালোবাসা জানিয়ে লিখেছেন-
"স্রষ্টার কাছে মানুষ সবাই সমান,
রক্তে মাংসে গড়া দেহ নাহি ব্যবধান।
অন্ধ ল্যাংড়া হাবা বোবা যত সৃষ্টি ভবে,
স্রষ্টা করেছেন সৃষ্টি বিভেদ কি তবে?
...যত প্রতিবন্ধী আছে মানুষ ওরাও
অবহেলা কর না তুমি পাশে দাঁড়াও।"
কংশ নদীর টলোমলো জলকে যারা ভালোবেসেছেন, তাঁদেরই একজন কবি মাজেদুল হক। পাড়ে বসে শান্ত নদীটির স্নিগ্ধ জলে প্রিয়ার আনত মুখ তার কাছে কতইনা মায়াময়ী! তিনি লিখেছেন-
"শুধু মনে লয় যতটা সময়
চুপচাপ বসে থাকি
শ্যামল চিত্তে নব সাহিত্যে
প্রিয়ার ছবিটা আঁকি।" ('কংশনীড়' কবিতা)
সময় পেড়িয়ে একদিন কংশের পাড়ে ঝড় আসে। শান্ত-স্নিগ্ধ জলের উত্তাল ঢেউয়ের ঝাপটা একদিন কবির বুকের ঝড়ের প্রতিরূপ হয়ে আবির্ভূত হয়। কংশ তীরের কবির কষ্টজাত চোখের জল যেন কংশের শান্ত নদীকে স্রোতস্বীনি করেছে। বুকের জমে থাকা কষ্টে কবির চোখ ফেটে যে জলধারা বয় তাই এখন কংশের বান হয়ে বইছে। কিন্তু চোখের জলে কী আর জীবনের সব দায় সুদ করা যায়? কারণ কবিকে নিকট অতীতের এক প্রিয়জন দীর্ঘশ্বাসে বলেছিল (কবির ভাষায়)-
"তাহার মাথায় রেখে আমার দু'হাত,
কসম দিয়াছে মোরে থাকিতে হায়াত;
হয়তো ঝড় উঠিবে
কত কি বলিবে-
ছাড়িয়া যাবে না মোরে দু'টি পায়ে ধরি,
তোমার জীবন সাথী হয়ে যেন মরি।
('অপহরণ' কবিতা)
কবি হয়তো সেদিন তাঁর হারানোর ভয়কে মিলনের আশা দিয়ে জয় করতে পারেননি। সেজন্য নিজের ব্যর্থতার কারণটির পেছনে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন তাঁর 'ব্যর্থতা' নামক কবিতার একটি স্তবকে-
"নিরুপায় আমি উত্তর দিতে,
আশায় ছিলাম সাথী করে নিতে;
ভয় ছিল তবু,
শপথ রাখিতে না পারিলে কভু।"
সত্যি, উপনদীর মত দুটি মন পাশাপাশি পথ চলতে চলতে একদিন তারা এক মোহনায় মিলিত হয়ে আজ হঠাৎ শাখানদী হয়ে দু'জনের বিপরীত দিকে চলে যাওয়া কবির মনকে বেদনায় ছিন্নভিন্ন করেছে।
কবি দীর্ঘশ্বাসে বলেছেন-
"বিধির কি যে বিধান পারিনা বুঝিতে,
প্রিয়জন কেড়ে নিল কঠোর নীতিতে;"
তবে কবির চোখের জল শুধু ভালোবাসার মানুষটিকে হারানোর উৎসজাত জল নয়। এই বেদনা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান কঠিন কঠোর সমাজ বাস্তবতা থেকেও সৃষ্ট হয়েছে। কবি মন সামাজিক ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী। পাশাপাশি তথাকথিত আধুনিকতা আর যুক্তিবর্জিত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ কবিমনে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। যখন কবি দেখেন সন্তান মতিভ্রমে পড়ে সে তার বয়োঃবৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে আসে('বৃদ্ধাশ্রম' কবিতা), যখন গরিবের প্রতি সমাজের অবিচার নেমে আসে, নিয়ম-নীতি উলটে গিয়ে স্বার্থের বেড়াজালে আটকে সত্য যখন নির্বাসিত থাকে ('সত্য কলংকিত' কবিতা), তখন এসব কবির বেদনা-বিরহকে আরো তীব্রতায় পর্যবসিত করে। তাই কবি মাজেদুল হকের বিরহ শুধু প্রিয়া হারানোর ব্যথা-বিরহ নয়। সমাজের অসংগতি, দুর্নীতি, অবিচার ও মিথ্যারাও কবিমনের এই ব্যথা-বিরহের জন্য দায়ী। তবে ব্যথাতুর কবির মাঝে মাঝে ভাবনায় আসে-
"থাকিতে হায়াৎ
কভু দু'জনে কি হবে সাক্ষাৎ?
নিয়ে গেল তাকে নিদয়ার মত,
সে তাকায় ফিরে তাই চেয়ে থাকি হৃদয়ে রয়েছে ক্ষত।"
('সাক্ষাত' কবিতা)
আর সে ক্ষত থেকে অনুভূত ব্যথায় কাতর হয়ে কবির চোখের লবণাক্ত অশ্রু প্রবাহিত হয়েই "চোখের জলে নদী" কাব্যগ্রন্থটির সৃষ্টি হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস।
"কবিতা জীবনের নানা রকম সমস্যার উদঘাটন; কিন্তু উদঘাটন দার্শনিকের মত নয়; যা উদঘাটিত হলো তা যে কোনো জটরের থেকেই হোক আসবে সৌন্দর্যের রুপে," 'যা কল্পনাকে তৃপ্তি দেবে; যদি তা না দেয় তাহলে তা কবিতা নয়, উদঘাটিত এই সিদ্ধান্ত হয়তো পুরনো চিন্তার শুধুই এক নতুন আবৃত্তি মাত্র'
সুতরাং বাহিরের জগতের রুপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-শব্দ বা আপন মনের ভাবনা, বেদনা ও কল্পনাকে অনুভূতিস্নিগ্ধ ছন্দবদ্ধ তনুশ্রী দান করতে গিয়ে মাজেদুল হকের কবিতা দার্শনিক সুলভ না হলেও তার কবিতা পাঠকের আপন বিরহ-ব্যাথা, হাসি-কান্না ও সৌন্দর্য রুপেই কল্পনায় ধরা দেয়। সেই দিকটি তাঁর কবিতায় ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন বলেই মাজেদুল হক বাংলা সাহিত্যের একজন স্বার্থক কবি। তাই, বাংলাদেশের সাহিত্যপ্রেমী মানুষেরা আজ চলুন ব্যথাকাতর এই বিরহী কবির প্রতি আমরা ভালোবাসা ও প্রিয়া হারানোর সমবেদনা জানাই।
সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ খায়রুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: উত্তর আব্দুল্লাহপুর কোটবাড়ি ফায়দাবাদ ঢাকা।
মোবাইল: 01968525877
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ২০২৬