এম এ মান্নান স্টাফ রিপোর্টার নিয়ামতপুর (নওগাঁ)
বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার ঠাকুর মান্দা গ্রামে অবস্থিত শ্রী শ্রী রঘুনাথ জিউ মন্দির একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। বহু বছর ধরে এটি শুধু একটি পূজাস্থল নয়, বরং স্থানীয় মানুষের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর এখানে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে রাম জন্মোৎসব উদযাপন করা হয়, যা এলাকাবাসীর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান।মন্দিরটির সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য লিখিত তথ্য না থাকলেও মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক সত্যেন্দ্রনাথ প্রাং-এর মতে, এটি আনুমানিক ৩০০ থেকে ৪০০ বছর পুরনো। এই দীর্ঘ সময় ধরে মন্দিরটি স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস ও আস্থার কেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে পূজা-অর্চনা চলে আসছে, যা এর ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।এই মন্দিরের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক দিক হলো—এখানে মানত করলে নাকি জন্মান্ধ বা দৃষ্টিশক্তিহীন মানুষ দৃষ্টি ফিরে পায়—এমন একটি প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। ঠাকুর মশাইসহ অনেকেই এই ধরনের ঘটনার কথা উল্লেখ করেন।মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক সত্যেন্দ্রনাথ প্রাং নিজেও একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি জানান, একসময় তিনি একটি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার জন্য তিনি ঢাকা, রাজশাহী এমনকি ভারতের ভেলোর পর্যন্ত গিয়েও সুস্থতা লাভ করতে পারেননি। চিকিৎসকেরা অপারেশনের পরামর্শ দেন। কিন্তু দেশে ফিরে তিনি শ্রী শ্রী রঘুনাথ জিউ মন্দিরে মানত করেন। তার ভাষ্যমতে, মাত্র দুই দিনের মধ্যেই তিনি আরোগ্য লাভ করতে শুরু করেন, যা তিনি নিজের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরেন।এই ধরনের অভিজ্ঞতা মন্দিরটিকে স্থানীয় মানুষের কাছে আরও অলৌকিক ও পবিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।প্রতি বছর রাম জন্মোৎসব উপলক্ষে এখানে দশ দিনব্যাপী এক বৃহৎ মেলার আয়োজন করা হয়। এই মেলায় দূর-দূরান্ত থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। পূজা-অর্চনার পাশাপাশি মেলাটি হয়ে ওঠে একটি সামাজিক মিলনমেলা, যেখানে বিভিন্ন পণ্য, খাবার এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সমাহার ঘটে।এই উৎসব স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং এলাকার মানুষের মধ্যে আনন্দ ও উৎসবের আমেজ সৃষ্টি করে।মন্দিরটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর চারপাশে গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। ঠাকুর মশাইয়ের মতে, এখানে কখনো কোনো জঙ্গি তৎপরতা বা ধর্মীয় বিরোধের ঘটনা ঘটেনি। বরং আশেপাশের মুসলিম পরিবারগুলো পূজা উপলক্ষে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।এটি প্রমাণ করে যে ধর্ম ভিন্ন হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।মন্দিরটির সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি কমিটি রয়েছে। বর্তমান কমিটির সদস্যরা হলেন—সভাপতি: চন্দন কুমার মৈত্র,সাধারণ সম্পাদক: সত্যেন্দ্রনাথ প্রাং,কোষাধ্যক্ষ: প্রদীপ কুমার মন্ডল,কেয়ারটেকার: চন্দন দাস। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মন্দিরের ধর্মীয় কার্যক্রম ও সামাজিক উদ্যোগগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে।শ্রী শ্রী রঘুনাথ জিউ মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক। অলৌকিক ঘটনার গল্প, প্রাচীন ইতিহাস, বৃহৎ উৎসব এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে এই মন্দিরটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভবিষ্যতেও এই মন্দির মানুষের আস্থা ও ভক্তির কেন্দ্র হিসেবে টিকে থাকবে—এটাই সবার প্রত্যাশা।
সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ খায়রুল ইসলাম
প্রধান কার্যালয়: উত্তর আব্দুল্লাহপুর কোটবাড়ি ফায়দাবাদ ঢাকা।
মোবাইল: 01968525877
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ২০২৬