
অপু দাস, ব্যুরো প্রধান, রাজশাহী
উত্তরাঞ্চলের প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ রোগীর অস্বাভাবিক চাপের কারণে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।নির্ধারিত শয্যার তুলনায় প্রায় তিনগুণ রোগী ভর্তি থাকায় হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে সৃষ্টি হয়েছে চরম ভিড়। বেড না পেয়ে অনেক রোগীকে মেঝে, বারান্দা এমনকি সিঁড়ির পাশেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। জনবল সংকট, ওষুধের ঘাটতি এবং সীমিত আইসিইউ সুবিধা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ১২০০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার রোগী ভর্তি থাকছেন। ৫৮টি ওয়ার্ডে রোগীর অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে গিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। অন্যদিকে বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন, যা হাসপাতালের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
চিকিৎসক সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন ২৮৩ জন, ইন্টার্ন চিকিৎসক ২২০ জন এবং নার্স প্রায় ১২০০ জন। তবে এই জনবল হাসপাতালের বর্তমান চাহিদার তুলনায় অনেক কম। উল্লেখ্য, ১৯৫৮ সালে ৫৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়লেও জনবল সেই অনুপাতে বাড়েনি।রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও সময়মতো চিকিৎসকের দেখা পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। বেড সংকটের কারণে মেঝে বা বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নেওয়ার মতো অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন তারা।সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে শিশু বিভাগে। তিনটি ওয়ার্ডে ২০০ শয্যার বিপরীতে ৫০০-এর বেশি শিশু ভর্তি রয়েছে। অনেক সময় একটি বেডে একাধিক শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। রাজশাহী ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা রোগীদের কারণে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে।আইসিইউ সংকট এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। হাসপাতালে মোট ৪০টি আইসিইউ বেড রয়েছে, যার মধ্যে শিশুদের জন্য মাত্র ১২টি। ভেন্টিলেটর রয়েছে ৩৫টি। প্রতিদিন বহু গুরুতর অসুস্থ শিশু আইসিইউর অপেক্ষায় থাকলেও পর্যাপ্ত বেড না থাকায় অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছে না।সম্প্রতি হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সংক্রামক এই রোগে আক্রান্ত শিশুদের অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ওয়ার্ডে রাখতে হচ্ছে, যা অন্যদের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, হামের জটিলতায় দ্রুত আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হলেও তা সবসময় পাওয়া যাচ্ছে না।এদিকে, ২০২৩ সালে নির্মিত ২০০ শয্যার একটি শিশু হাসপাতাল এখনো চালু হয়নি, যা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ রয়েছে। নতুন এই সুবিধাটি চালু হলে বর্তমান সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জরুরি ভিত্তিতে নতুন ভেন্টিলেটর সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত শয্যা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু আশ্বাস নয় কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমেই এই হাসপাতালের সেবার মান ফিরিয়ে আনা জরুরি।