
নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর:
গাজীপুরে পেশাগত দায়িত্ব পালন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকায় এক সাংবাদিক নেতার ওপর বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। গাজীপুর জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এম কাজল খানকে লক্ষ্য করে এই পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। শনিবার (১১ জুলাই) রাত পৌনে ১২টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর চৌধুরী বাড়ি এলাকার শোভন চৌধুরী মার্কেটে অবস্থিত রিপোর্টার্স ইউনিটির কার্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এই ন্যাক্কারজনক হামলার পর থেকে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে গাজীপুরের সাংবাদিক অঙ্গন।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক নেতা এম কাজল খান জানান, প্রতিদিনের মতো শনিবার রাতেও তিনি পেশাগত কাজ শেষে চৌধুরী বাড়ি এলাকায় অবস্থিত গাজীপুর জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটির কার্যালয়ে যাচ্ছিলেন। কার্যালয়ের প্রবেশদ্বারে পৌঁছানো মাত্রই ওত পেতে থাকা একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। রামদা, লাঠিসোঁটাসহ দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সন্ত্রাসীরা তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। কাজল খানের চিৎকারে আশেপাশের লোকজন ও অন্যান্য সংবাদকর্মীরা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
এম কাজল খানের অভিযোগ, শোভন চৌধুরী মার্কেটের স্বত্বাধিকারী আলহাজ হাফিজ উদ্দিন চৌধুরীর প্রত্যক্ষ নির্দেশে ও পরিকল্পনায় এই হামলা চালানো হয়েছে। হামলাকারী দলটির নেতৃত্বে ছিল ‘নয়ন’ নামে এক চিহ্নিত অপরাধী, যার বিরুদ্ধে এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ একাধিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। মূলত নয়ন ও তার অনুসারী ৪-৫ জন সন্ত্রাসী এই হামলায় সরাসরি অংশ নেয়।
আহত সাংবাদিক কাজল খান দাবি করেন, গাজীপুর ও এর আশেপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান নানা অনিয়ম, ভূমি দস্যুতা, মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করে আসছিলেন। একই সঙ্গে স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক অসংগতির বিরুদ্ধেও তিনি সর্বদা সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন। এই সংবাদ প্রকাশের জেরে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল এবং অপরাধী চক্র তাঁর ওপর দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুব্ধ ছিল। সেই পুরনো আক্রোশ ও প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যেই সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করতে এই পরিকল্পিত ও কাপুরুষোচিত হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
হামলার শিকার হওয়ার পরপরই রক্তাক্ত ও রক্তাক্তপ্রায় অবস্থায় এম কাজল খান দ্রুত বাসন মেট্রো থানায় সশরীরে উপস্থিত হয়ে ডিউটি অফিসার ও ওসিকে বিষয়টি অবহিত করেন। ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনা করে বাসন মেট্রো থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হারুন অর রশিদ তাৎক্ষণিকভাবে একদল পুলিশ ফোর্সকে ঘটনাস্থলে পাঠান। তবে পুলিশের সাইরেন ও উপস্থিতি টের পেয়ে মূল হোতা নয়নসহ অন্যান্য হামলাকারীরা আগেই এলাকা ছেড়ে সটকে পড়ে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে এবং আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে।
এ বিষয়ে বাসন মেট্রো থানার ওসি মো. হারুন অর রশিদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “একজন সাংবাদিক নেতার ওপর হামলার বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেখছি। ইতিমধ্যে মূল হামলাকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে এবং বিভিন্ন স্থানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধী যে-ই হোক না কেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হবে।
এদিকে সাংবাদিক নেতার ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে গাজীপুরের সংবাদকর্মীদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। গভীর রাতেই বিভিন্ন গণমাধ্যমের কর্মীরা থানায় ও ঘটনাস্থলে জড়ো হন। গাজীপুর জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটির পক্ষ থেকে এক জরুরি বিবৃতিতে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও অন্যান্য শীর্ষ নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, “সাংবাদিকদের ওপর এমন কাপুরুষোচিত হামলা স্পষ্টতই মুক্ত গণমাধ্যম ও স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য এক বিরাট হুমকি। সত্যের পক্ষে কথা বলায় যদি সাংবাদিকদের এভাবে হামলার শিকার হতে হয়, তবে সমাজে অপরাধীদের রাজত্ব কায়েম হবে। আমরা প্রশাসনকে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মূল পরিকল্পনাকারী হাফিজ উদ্দিন চৌধুরী এবং সন্ত্রাসী নয়নসহ সকল হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করতে হবে। অন্যথায় গাজীপুরের সকল স্তরের সাংবাদিকদের সাথে নিয়ে রাজপথে কঠোর ও বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরাও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, গণমাধ্যম হলো সমাজের দর্পণ এবং চতুর্থ স্তম্ভ। যদি গণমাধ্যমকর্মীদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে সমাজের অসংগতি, দুর্নীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর চলা অন্যায়-অত্যাচার তুলে ধরা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। তাই স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ঘটনার একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি এখন সর্বস্তরের মানুষের।