
ভোলার মনপুরায় কোস্ট গার্ড ও পুলিশের এক সফল যৌথ অভিযানে মায়ানমারে পাচারের সময় বিপুল পরিমাণ চোরাই মালামাল জব্দ করা হয়েছে। এই অভিযানে ৪৫০ বস্তা সিমেন্ট ও ৪ বস্তা ডিএপি (DAP) সারসহ এক পাচারকারীকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। একই সাথে পাচার কাজে ব্যবহৃত একটি ফিশিং বোটও ক্রোক করা হয়েছে। রবিবার (০৫ জুলাই ২০২৬) বিকালে কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, দেশের সীমান্ত ও নদীপথে যেকোনো ধরনের অবৈধ চোরাচালান রোধে কোস্ট গার্ড সর্বদা তৎপর রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এই বিশেষ অভিযানটি পরিচালনা করা হয়।
কোস্ট গার্ড সূত্রে জানা গেছে, ভোলার মনপুরা থানাধীন উত্তর সাঁকুচিয়া লতাখালী ঘাট সংলগ্ন এলাকায় নদীপথ ব্যবহার করে মায়ানমারে বিপুল পরিমাণ নিত্যপ্রয়োজনীয় ও নির্মাণ সামগ্রী পাচার করা হচ্ছে—এমন একটি গোপন সংবাদ আসে কোস্ট গার্ডের কাছে। তথ্যের সত্যতা যাচাই ও পাচারকারীদের রুখে দিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয় প্রশাসন। গত ৪ জুলাই ২০২৬ শনিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৩ টায় কোস্ট গার্ড আউটপোস্ট মনপুরা এবং স্থানীয় থানা পুলিশের সমন্বয়ে ওই এলাকায় একটি বিশেষ যৌথ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হয়। গভীর রাতে লতাখালী ঘাট এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে পাচারকারীরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলায় তারা ব্যর্থ হয়।
অভিযান চলাকালীন লতাখালী ঘাট সংলগ্ন নদীতে ভাসমান একটি সন্দেহভাজন ফিশিং বোটকে থামার নির্দেশ দেয় যৌথ বাহিনী। বোটটি থামাতে বাধ্য করার পর কোস্ট গার্ড ও পুলিশের চৌকস দল সেটিতে তল্লাশি চালায়। তল্লাশিকালে বোটের ভেতর স্তূপ করে রাখা অবৈধভাবে মায়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে বহনকৃত বিপুল পরিমাণ মালামাল উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকৃত মালামালের মধ্যে রয়েছে:
সিমেন্ট: ৪৫০ বস্তা (যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ২ লক্ষ ২৯ হাজার টাকা)
ডিএপি (DAP) সার: ৪ বস্তা
পরিবহন: পাচারকাজে ব্যবহৃত ১টি অবৈধ ফিশিং বোট
অভিযানস্থলে অবৈধভাবে এই মালামাল বহনের কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় এবং পাচারের উদ্দেশ্যে নদীপথে ভ্রমণের অপরাধে বোটের ভেতর থাকা একজন পাচারকারীকে আটক করা হয়। আটককৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে চোরাচালান বিরোধী আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরার ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রটি বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্য অবৈধ উপায়ে নদী ও সমুদ্রপথে মায়ানমারসহ বিভিন্ন স্থানে পাচার করে আসছিল। বিশেষ করে সিমেন্ট, সার ও বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী পাচারের প্রবণতা ইদানিং বৃদ্ধি পেয়েছে। নদী ও সমুদ্র উপকূলবর্তী প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় রাতের অন্ধকারকে পুঁজি করে পাচারকারীরা এই রুট ব্যবহার করার চেষ্টা করে। তবে কোস্ট গার্ডের এই সময়োপযোগী ও কঠোর পদক্ষেপের ফলে পাচারকারীদের বড় একটি পরিকল্পনা নসাৎ হয়ে গেল বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তারা কোস্ট গার্ড ও পুলিশের এই যৌথ ভূমিকাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, জব্দকৃত চোরাই মালামাল, পাচার কাজে ব্যবহৃত ফিশিং বোট এবং আটককৃত পাচারকারীকে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মনপুরা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে আটককৃত আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই চক্রের মূল হোতাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের আওতাভুক্ত এলাকাগুলোতে যেকোনো ধরনের আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী কর্মকাণ্ড, মাদক পাচার, মানব পাচার এবং চোরাচালান রোধে কোস্ট গার্ড জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছে। দেশের সম্পদ রক্ষার্থে এবং চোরাচালানকারীদের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে ভবিষ্যতেও কোস্ট গার্ডের এই ধরনের ঝটিকা ও যৌথ অভিযান অব্যাহত থাকবে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।