
আবরার নুর ফাহিম নাটোর।
দেশের প্রতিটি মানুষ যাতে বুক ফুলিয়ে বলতে পারে—আমরা ভালো আছি, আমরা শান্তিতে আছি; সেই লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে। মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আমরা কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, দৃশ্যমান কিছু করতে চাই। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কোনো রকম দুর্নীতি বা অনিয়ম আমরা সহ্য করব না, এ ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত সোচ্চার। শনিবার নাটোরের লালপুর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত কৃষি প্রণোদনা বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল এ কথা বলেন। স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার দেশের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, “আমাদের হাতে সময় খুব কম, মাত্র পাঁচ বছর। এই সময়ের মধ্যেই সরকার যেসব মেগা প্রজেক্ট এবং জনকল্যাণমূলক কাজের সূচনা করেছে, তা সফলভাবে শেষ করতে আমরা দিনরাত কাজ করছি। প্রতিটি দপ্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আমাদের প্রধান অঙ্গীকার।”
দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের ওপর জোর দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নের নামে কোনো পকেট ভারী করার সুযোগ নেই। স্বচ্ছতা ও সততাই হবে উন্নয়নের মূল ভিত্তি। তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল তার বক্তব্যে ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালুর বিষয়ে আশাব্যঞ্জক বার্তা দেন। তিনি বলেন, “শুধু লালপুর নয়, পুরো উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতির চাকা সচল করতে ঈশ্বরদী বিমানবন্দর পুনরায় চালু করা অত্যন্ত জরুরি। বিষয়টি আমার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে এবং দ্রুত এটি চালু করার লক্ষ্যে আমি কাজ করছি। এটি কার্যকর হলে অত্র এলাকায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, বাড়বে কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ। তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন নতুন কাজের দুয়ার খুলে যাবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নাটোর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় লালপুর উপজেলার কৃষকদের মাঝে আমন ধানের বীজ, গ্রীষ্মকালীন শাকসবজির বীজ এবং প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার বিতরণ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়, মোট ১ হাজার ৫০০ জন কৃষককে উফসী রোপা আমন ধানের বীজ এবং রাসায়নিক সার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ১ হাজার ২০০ জন কৃষককে গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি চাষের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ ও সার সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। প্রতিটি আমন চাষীকে ৫ কেজি বীজ, ১০ কেজি এমওপি সার এবং ১০ কেজি ডিএপি সার দেওয়া হয়। অন্যদিকে, শাকসবজি চাষীদের দেওয়া হয় ৩০০ গ্রাম বীজ এবং ১৫ কেজি করে এমওপি ও ডিএপি সার।
শুধু বীজ বা সার নয়, পরিবেশ রক্ষায়ও সরকার সচেতন। অনুষ্ঠানে ১৩১টি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মোট ৩ হাজার ৮৫০টি ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া জৈব সার ও বাঁশের খুঁটিও সরবরাহ করা হয়েছে, যাতে কৃষকরা পরিবেশবান্ধব উপায়ে চাষাবাদ করতে পারেন। কৃষিখাতের বাইরেও ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সরকার যে আন্তরিক, তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে উপজেলার ১৫টি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে মোট ৫ লাখ ৫ হাজার টাকার চেক বিতরণ করা হয়। এই অনুদান সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মানসম্মত শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বরকত উল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ প্রীতম কুমার হোড়। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ও সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হারুনার রশিদ পাপ্পু, গোপালপুর পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক পৌর মেয়র নজরুল ইসলাম মোলাম, উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ছিদ্দিক আলী মিষ্টু এবং ঈশ্বরদী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ঈশ্বরদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ রনজু। বক্তারা সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, মাঠ পর্যায়ের কৃষকের হাতে প্রণোদনা পৌঁছানোয় খাদ্য উৎপাদনে এটি বড় ভূমিকা রাখবে। তারা প্রতিমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এলাকার উন্নয়নে এমন দৃশ্যমান পদক্ষেপ অতীতে খুব একটা দেখা যায়নি।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, তিনি কেবল দাপ্তরিক কাজ নয়, বরং সাধারণ মানুষের মনের ভাষা বুঝতে চান। তিনি বলেন, “আপনারা আমাদেরকে সহযোগিতা করেন, সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করুন। সরকার আপনাদের সেবক হিসেবে কাজ করছে। ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালুসহ যে উন্নয়ন পরিকল্পনা আমাদের আছে, তা বাস্তবায়ন হলে নাটোর ও পাবনা অঞ্চল কেবল কৃষিতে নয়, বাণিজ্যের দিক থেকেও দেশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হবে। পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিটি নাগরিককে সোচ্চার থাকার আহ্বান জানিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়। কৃষকদের মুখে চওড়া হাসি আর নতুন প্রত্যাশা নিয়ে শেষ হওয়া এই আয়োজন স্থানীয় জনমনে নতুন এক আশার সঞ্চার করেছে।