
সৌদি নেতৃত্বাধীন ১৪ রাষ্ট্রের জোটে বাংলাদেশ: ভূরাজনীতির বাস্তবতা ও কৌশলগত প্রশ্ন — আইনজীবী জিয়াবুল আলমের বিশ্লেষণ।
বেলাল উদ্দিন এম,এ
টেকনাফ প্রতিনিধি:
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো সামরিক বা নিরাপত্তা জোটকে তার ঘোষিত উদ্দেশ্য দিয়ে বিচার করলে প্রায়ই পুরো চিত্রটি ধরা যায় না। ইতিহাস বলে, ন্যাটো, সেন্টো, সিয়াটো কিংবা উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামো—সবকিছুর পেছনেই ছিল বৃহত্তর শক্তির কৌশলগত স্বার্থ। আজ সৌদি আরবের নেতৃত্বে ঘোষিত ১৪ রাষ্ট্রের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটও সেই বাস্তবতার বাইরে নয়।
আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হচ্ছে, এই জোটের লক্ষ্য লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালী এবং এডেন উপসাগরে আন্তর্জাতিক নৌপথ ও জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে এটি এমন এক সময়ে গঠিত হয়েছে, যখন ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনীর হামলা, ইরান–সৌদি উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাত একে সরাসরি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশ যদি এই জোটে সমর্থন দিয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি কেবল একটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির নীতিকে গুরুত্ব দেয়। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের কূটনীতির মূল ভিত্তি ছিল—”সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।” এই নীতি কোনো আবেগের ফল নয়; এটি একটি ছোট ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের টিকে থাকার কৌশল।
আজকের মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে ধর্মীয় বিভাজন হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবতা অনেক গভীর। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে এবং ইউরোপ–এশিয়া বাণিজ্যের একটি বড় অংশ বাব আল-মান্দেব ও সুয়েজ করিডোর দিয়ে অতিক্রম করে। এই রুটে অস্থিরতা মানে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি। তাই যে রাষ্ট্র এই করিডোর নিয়ন্ত্রণ করবে, সে বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও প্রভাব বিস্তার করবে।
এই বাস্তবতায় সৌদি আরবের নতুন জোট কেবল নৌপথ রক্ষার উদ্যোগ নয়; এটি লাল সাগর অঞ্চলে একটি নতুন নিরাপত্তা স্থাপত্য তৈরির প্রচেষ্টা। এর মাধ্যমে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব সীমিত করা এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের লক্ষ্যও বিশ্লেষকদের আলোচনায় উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আমাদের লাভ কী?
বাংলাদেশ কোনো উপসাগরীয় শক্তি নয়, কোনো সামুদ্রিক সামরিক জোটের কেন্দ্রও নয়। কিন্তু বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র, যার অর্থনীতি নির্ভর করে রপ্তানি, আমদানি, প্রবাসী আয় এবং স্থিতিশীল জ্বালানি বাজারের ওপর। তাই বাংলাদেশের ভূমিকা হওয়া উচিত উত্তেজনা কমানোর পক্ষে, কোনো পক্ষের নিরাপত্তা বলয়ের দৃশ্যমান অংশ হওয়া নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy)। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী (Realist) তত্ত্ব বলে, ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। একবার কোনো সামরিক বা নিরাপত্তা বলয়ের সঙ্গে দৃশ্যমানভাবে যুক্ত হলে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক বিকল্প সংকুচিত হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার। অন্যদিকে ইরান ভবিষ্যতে জ্বালানি, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগের সম্ভাব্য অংশীদার। ফলে এক পক্ষের নিরাপত্তা উদ্যোগে দৃশ্যমান অবস্থান অন্য পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ককে জটিল করতে পারে। পররাষ্ট্রনীতিতে আবেগের স্থান নেই; সেখানে থাকে কেবল জাতীয় স্বার্থ।
আরও একটি দিক উপেক্ষা করা যায় না। ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চল এখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং অন্যান্য বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার কেন্দ্র। ছোট রাষ্ট্রগুলো যদি এই প্রতিযোগিতায় ভারসাম্য হারায়, তাহলে তারা ধীরে ধীরে বড় শক্তির কৌশলগত প্রভাব বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ অতীতে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (NAM) মূল্যবোধকে সমর্থন করেছে এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে একটি বিশ্বাসযোগ্য রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি গড়ে তুলেছে। সেই ঐতিহ্য রক্ষা করা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে খুশি করার জন্য নয়; এটি ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ রক্ষার জন্য। তাই বাংলাদেশকে এমন অবস্থান গ্রহণ করতে হবে, যাতে লোহিত সাগরের উত্তাল ঢেউ কখনো বঙ্গোপসাগরের কূটনৈতিক ভারসাম্যকে ভেঙে দিতে না পারে।
কারণ ভূরাজনীতির দাবার বোর্ডে সবচেয়ে সফল রাষ্ট্র সেই, যে অন্যের যুদ্ধে সৈনিক নয়—নিজের স্বার্থের রক্ষা।