
নিজস্ব প্রতিবেদক
পিরিয়ড বা মাসিক—নারীদের জীবনের এক স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। দীর্ঘকাল ধরে একে কেবল প্রজনন চক্রের অংশ হিসেবে দেখা হলেও, আধুনিক বিজ্ঞান এখন বলছে ভিন্ন কথা। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি মাসের এই রক্তপাত আসলে শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নানা রোগের গুরুত্বপূর্ণ বার্তাবাহক। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, পিরিয়ডের রক্ত কেবল বর্জ্য নয়, বরং এটি একটি প্রাকৃতিক ‘বায়োপসি’ বা পূর্ণাঙ্গ ‘স্বাস্থ্য প্রতিবেদন’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
গবেষকদের মতে, পিরিয়ডের রক্তে এমন কিছু তথ্য থাকে যা সাধারণ রক্ত বা লালার পরীক্ষায় ধরা পড়ে না। এতে জরায়ু, ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান টিউব এবং যোনিপথ থেকে আসা কোষ, হরমোন, প্রোটিন ও ব্যাকটেরিয়া মিশ্রিত থাকে। ফলে এটি বিশ্লেষণ করলে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত ধারণা পাওয়া সম্ভব।
বিশেষ করে এন্ডোমেট্রিওসিস নামক জটিল রোগ নির্ণয়ে এই রক্ত এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। বর্তমানে এই রোগ শনাক্ত করতে ‘ল্যাপারোস্কোপি’র মতো কষ্টকর অস্ত্রোপচার ও ক্যামেরার সাহায্য নিতে হয়। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘নেক্সটজেন জেন’-এর প্রধান নির্বাহী রিধি তারিয়াল জানান, ভবিষ্যতে কেবল পিরিয়ডের রক্ত বিশ্লেষণ করেই এই রোগ সহজে শনাক্ত করা যাবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই রক্তে কয়েকশ প্রোটিন ও জৈবিক উপাদান থাকে যা নিচের সমস্যাগুলো শনাক্তে সাহায্য করতে পারে:
ক্যানসার ও প্রদাহ: জরায়ুর ক্যানসার, অ্যাডেনোমায়োসিস এবং অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন প্রদাহ।
হরমোন ও অটোইমিউন রোগ: থাইরয়েড সমস্যা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং অটোইমিউন জটিলতা।
ডায়াবেটিস ও পুষ্টি: মাসিকের রক্তে শর্করার মাত্রা দেখে ডায়াবেটিস শনাক্তকরণ এবং ভিটামিন ডি-এর অভাব নির্ণয়।
যৌনবাহিত সংক্রমণ: এইচপিভি (HPV), ক্ল্যামাইডিয়া বা গনোরিয়ার মতো সংক্রমণ শনাক্তে এটি প্রচলিত ‘প্যাপ স্মিয়ার’ পরীক্ষার চেয়েও কার্যকর হতে পারে।
পিরিয়ডের রক্ত আর কেবল বর্জ্য নয়, এটি ভবিষ্যতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক শক্তিশালী হাতিয়ার।”
এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সামাজিক কুসংস্কার, লজ্জা এবং নারীস্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলার কারণে দীর্ঘদিন এই ক্ষেত্রটি গবেষণার বাইরে ছিল। তবে বর্তমানে বৈশ্বিক বায়োটেক কোম্পানিগুলো এই রক্ত পরীক্ষার সহজ প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করছে। এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে নারীরা হয়তো ঘরে বসেই পরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত রোগ শনাক্ত করতে পারবেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, এই গবেষণা সফল হলে রোগ নির্ণয় হবে আরও সহজ ও সাশ্রয়ী, যা কোটি কোটি নারীর দীর্ঘদিনের শারীরিক কষ্ট ও অনিশ্চয়তা দূর করবে।