
গোদাগাড়ীতে এক নেতার বিরুদ্ধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখল, নিয়োগ বাণিজ্য ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
ব্যুরো প্রধান, রাজশাহী।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী এলাকায় এক স্থানীয় বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বালুমহাল ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সম্পদের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ৬ নম্বর মাটিকাটা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এহসানুল কবির টুকু। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি দলীয় প্রভাব খাটিয়ে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি পদ দখল, নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থ আটকে রাখা এবং প্রভাব বিস্তারের মতো নানা কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা থেকে এলাকায় এসে দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে এহসানুল কবির টুকু ও তার পরিবারের সদস্যরা অন্তত পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেন। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেই অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত পরিচালনা কমিটি গঠনের বিধান থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে অ্যাডহক কমিটি বহাল রেখে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে ধরে রেখেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রেমতলী এলাকার বাসিন্দা হলেও তিনি প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ভাটোপাড়া বালিকা বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এখনও নিয়মিত কমিটি গঠন করা হয়নি। একইভাবে প্রেমতলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতির দায়িত্বও তিনি দীর্ঘদিন ধরে পালন করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত কমিটি গঠন প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা হয়েছে।
প্রেমতলী জসীমউদ্দীন দাখিল মাদ্রাসা নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। মাদ্রাসাটি এহসানুল কবির টুকুর পিতা মৃত জসিম উদ্দিনের নামে প্রতিষ্ঠিত। অভিযোগ রয়েছে, পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে পুরো প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে। বড় ভাই শিক্ষানুরাগী সদস্য, মেজ ভাই সভাপতি এবং এহসানুল কবির টুকু নিজে বিদ্যুৎসাহী সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, গভর্নিং বডিতে অভিজ্ঞ ও শিক্ষিত সদস্য থাকা সত্ত্বেও তাদের মতামত উপেক্ষা করে সম্প্রতি দুটি করণিক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়োগকে ঘিরে প্রায় ২৬ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
প্রেমতলী সুখবাসিয়া উচ্চ বিদ্যালয় সম্পর্কেও একাধিক অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়টির সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির বিপুল পরিমাণ কৃষিজমির আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের একজন শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ায় অবস্থান করলেও তার নামে নিয়মিত এমপিওভুক্ত বেতন-ভাতা উত্তোলন করা হচ্ছে। এছাড়া সম্প্রতি বিদ্যালয়ের উন্নয়ন খাতে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার একটি বিশেষ বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাবও পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
প্রেমতলী ডিগ্রি মহাবিদ্যালয় নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কলেজের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখা হয়। পরে অর্থের বিনিময়ে তাদের পুনর্বহালের চেষ্টা চলছে বলে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
এ বিষয়ে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোজাহারুল ইসলাম বলেন, “এসব বিষয় মোবাইলে বলা ঠিক হবে না। সামনাসামনি বসলে অনেক কিছু বলা যাবে।”
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে স্থানীয় বালুমহাল নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমিতে পরিচালিত একটি বালুমহালের আয়ের একটি অংশ স্থানীয় মসজিদে দেওয়ার প্রচলন থাকলেও প্রায় এক লাখ টাকা এখনও মসজিদে দেওয়া হয়নি। এ অর্থ এহসানুল কবির টুকুর কাছে রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন মুসল্লি। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে বালু উত্তোলনের ফলে ভাঙনের ঝুঁকি বাড়লেও স্থানীয়দের আপত্তি উপেক্ষা করে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
কালিদিঘি এলাকার প্রায় ৭২ বিঘা রিসিভারভুক্ত জমি নিয়েও নতুন করে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পূর্ববর্তী সময়ে ওই জমি স্বল্পমূল্যে ভোগদখলে ছিল। চলতি মেয়াদে অন্য একজন ব্যক্তি সরকারি ডাকের মাধ্যমে ইজারা পাওয়ার পর তা নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই জমিতে চাষাবাদ বাধাগ্রস্ত করতে স্থানীয় গভীর নলকূপের অপারেটরকে কৃষকদের পানি না দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়।
ডিপ অপারেটর মিজানুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, “সব কাগজপত্রসহ ডিপের বরাদ্দ আমার নামে। সেটি জোরপূর্বক দখল করে নেওয়া হয়েছে।”
এছাড়া স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের পবিত্র তীর্থস্থান ‘গৌরাঙ্গ বাড়ি’-সংলগ্ন সম্পত্তি দখলের চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র আরও জানায়, এহসানুল কবির টুকুর পিতা মৃত জসিম উদ্দিন স্বাধীনতার পর প্রেমতলী এলাকায় বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে সরকারি চাকরির সময় তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হন বলে এলাকায় প্রচলিত আলোচনা রয়েছে। বর্তমানে পরিবারের সদস্যরা মূলত ঢাকায় বসবাস করেন। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এলাকায় এসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছ প্রশাসন নিশ্চিত করা, সরকারি সম্পত্তি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রভাবমুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এহসানুল কবির টুকুর ব্যবহৃত দুটি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।