
চান্দিনা–বরুড়া সড়ক যেন জনদুর্ভোগের আরেক নাম, সংস্কারের দাবিতে হাজারো মানুষের আকুতি”
মোঃ আনোয়ার পারভেজ
কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি:
গর্ত আর খানাখন্দে বিপর্যস্ত জনজীবন, ঝুঁকিতে রোগী ও শিক্ষার্থীরা; কৃষিপণ্য পরিবহনেও দুর্ভোগ।
কুমিল্লার চান্দিনা থেকে বরুড়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কের বেহাল অবস্থায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন দুই উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা। দীর্ঘদিন ধরে সড়কের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্ট গর্ত, খানাখন্দ ও ভাঙাচোরা অংশের কারণে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে সড়কের গর্তে বৃষ্টির পানি জমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি দ্রুত সংস্কার করা না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ
চান্দিনা হাইস্কুল মার্কেট এলাকা থেকে শুরু হয়ে ছায়কোট, তুলাতলী, শ্রীমন্তপুর, বরকইট, লতিফপুর ও খোশবাস হয়ে বরুড়া পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কটি স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য রিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে এই সড়ক ব্যবহার করেন।
কিন্তু সড়কের বিভিন্ন অংশের বেহাল অবস্থার কারণে স্বাভাবিক যাতায়াত এখন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোগী পরিবহনে চরম ভোগান্তি, সবচেয়ে বেশি বিপাকে প্রবীণ ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা
সড়কটির বেহাল অবস্থার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হচ্ছে চিকিৎসাসেবা গ্রহণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অসুস্থ রোগী, প্রবীণ ব্যক্তি ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের হাসপাতালে নেওয়ার সময় ভাঙাচোরা সড়কে যানবাহনের অতিরিক্ত ঝাঁকুনির কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সড়কের খানাখন্দের কারণে যানবাহন ধীরগতিতে চলতে বাধ্য হয়।
এলাকাবাসীর বক্তব্য, একটি সড়কের দুরবস্থা শুধু যোগাযোগব্যবস্থার সমস্যা নয়; এটি মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে প্রতিবন্ধকতা, উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা
চান্দিনা ও বরুড়ার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নিয়মিত এই সড়ক ব্যবহার করে।
সড়কের ভাঙাচোরা অবস্থা এবং বর্ষাকালে কাদা-পানি জমে থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিশেষ করে ছোট শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ রয়েছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ ও সহজ যোগাযোগব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করার অন্যতম সহায়ক উপাদান। ফলে গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গেও প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত।
কৃষি অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা
চান্দিনা ও বরুড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ গ্রামীণ অঞ্চলের কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষকের উৎপাদিত ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য স্থানীয় হাটবাজারে পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম এই সড়ক।
সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় হতে পারে। এতে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা বজায় রাখতে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার বিকল্প নেই। একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক দীর্ঘদিন সংস্কারবিহীন থাকলে তার প্রভাব শুধু যাতায়াতে সীমাবদ্ধ থাকে না; স্থানীয় উৎপাদন, বাজারব্যবস্থা ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও পড়ে।
সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দ থাকায় যানবাহন চলাচলের সময় ভারসাম্য হারানোর আশঙ্কা থাকে।
বিশেষ করে রাতে কিংবা বৃষ্টির সময় গর্তগুলো সহজে বোঝা যায় না। ফলে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও অন্যান্য ছোট যানবাহনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সড়ক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামত, প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সড়কের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা কার্যকর করা জরুরি।
শুধু সাময়িক মেরামত নয়, প্রয়োজন টেকসই সংস্কার
সড়ক সংস্কারের ক্ষেত্রে শুধু গর্ত ভরাট বা সাময়িক মেরামতের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ চিহ্নিত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী ভিত্তি মজবুত করা, মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে বৃষ্টির পানি যাতে সড়কের ওপর দীর্ঘ সময় জমে না থাকে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রকৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
একই সঙ্গে সংস্কারকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।
প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা
এলাকাবাসী চান্দিনা পৌরসভা, চান্দিনা ও বরুড়া উপজেলা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
তাঁদের দাবি, সড়কটির বর্তমান অবস্থা সরেজমিন পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দ্রুত সংস্কার প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
সড়কটির কোন অংশ কোন সংস্থার আওতাধীন, তা নির্ধারণ করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন এলাকাবাসী।
রাজনৈতিক পরিচয় নয়, নাগরিক অধিকার হিসেবে ভালো সড়ক চান এলাকাবাসী
সড়ক সংস্কারের দাবিকে কোনো রাজনৈতিক দাবি হিসেবে নয়, বরং সাধারণ মানুষের মৌলিক নাগরিক প্রয়োজন হিসেবে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাঁদের বক্তব্য—
“আমরা কোনো দলের পরিচয়ে নয়, গ্রামের সাধারণ মানুষ হিসেবে একটি ভালো রাস্তা চাই। এই রাস্তা দিয়ে আমাদের সন্তানরা বিদ্যালয়ে যায়, কৃষকেরা হাটবাজারে যান, অসুস্থ মানুষ হাসপাতালে যান। অথচ রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে প্রতিদিন আমাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আমরা দ্রুত এই সড়কের সংস্কার চাই।”
এলাকাবাসীর দাবি, উন্নয়নের সুফল তখনই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়, যখন যোগাযোগব্যবস্থা নিরাপদ, সহজ ও ব্যবহারোপযোগী থাকে।
জনস্বার্থে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন
চান্দিনা–বরুড়া সংযোগ সড়কের দুরবস্থা এখন স্থানীয় জনগণের অন্যতম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি সড়ক শুধু দুটি এলাকার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে না; এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তাই সড়কটির সংস্কারকে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন হিসেবে না দেখে জনস্বার্থ ও নাগরিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এখন প্রশ্ন একটাই—হাজারো মানুষের প্রতিদিনের দুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে?
চান্দিনা ও বরুড়ার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ করে সড়কটি নিরাপদ ও চলাচলের উপযোগী করে তুলবে।
কারণ, একটি নিরাপদ সড়ক শুধু উন্নয়নের প্রতীক নয়; এটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।