
ঢাকা প্রতিনিধি | অপরাধ অনুসন্ধান
রাজধানী ঢাকার উত্তরা, উত্তরখান ও দক্ষিণখান থেকে টঙ্গী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও মাদক কারবারের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে বিশেষভাবে উঠে এসেছে ‘দে লাড়া’ নামে পরিচিত একটি গ্রুপ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা এক নারীর প্রসঙ্গ। স্থানীয়ভাবে ওই নারী ‘ভাবি’ নামে পরিচিত বলে কয়েকজনের বরাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দৈনিক যুগান্তরের ১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটিতে গ্রুপটির কয়েকজন সদস্যের বক্তব্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবকটির স্বাধীন যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক অবস্থান আলাদাভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘দে লাড়া’ গ্রুপের তৎপরতা উত্তরা থেকে উত্তরখান ও দক্ষিণখান হয়ে টঙ্গী পর্যন্ত বিস্তৃত বলে দাবি করেছেন গ্রুপটির কয়েকজন সদস্য। তাদের বক্তব্যে উত্তরার ৮ নম্বর সেক্টর থেকে টঙ্গী রেলস্টেশন পর্যন্ত রেলপথের আশপাশে মাদক কেনাবেচার অভিযোগও উঠে এসেছে।
তাদের দাবি, এসব এলাকায় গাঁজা, ইয়াবা, আইস ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক কেনাবেচা হয়। মাদক কারবারের সঙ্গে গ্রুপটির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মাদক বেচাকেনার পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং পুরো নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো যাচাই করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য, মামলার নথি ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে সাকিবুল হাসান সানি ওরফে পিচ্চি সানির নাম গ্রুপটির শীর্ষ নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রায়হান নামের আরেক ব্যক্তিকে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলে দাবি করেছেন কয়েকজন সদস্য।
এ ছাড়া পলাশ, রনি শিকদার, মশিউর, সাইফুল, শাওন, শিপু, ফারুক, আসাদুল, ফাহিম, শহিদুল ও নাজমুল নামের কয়েকজনের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। তবে প্রতিবেদনে নাম উল্লেখ থাকাই তাঁদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করে না। প্রত্যেকের ভূমিকা নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো, গ্রুপটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা এক নারী, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘ভাবি’ নামে পরিচিত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর প্রকৃত নাম সম্পর্কে তথ্যদাতারা নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি। তাঁর স্বামীর নাম অপু বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে ওই নারীর পরিচয়, কথিত গ্রুপে তাঁর প্রকৃত ভূমিকা কিংবা মাদক কারবারের সঙ্গে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়। ফলে কেবল স্থানীয় পরিচিতি বা অন্যের বক্তব্যের ভিত্তিতে তাঁকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।
যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৯ অক্টোবর গ্রুপটির কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে উত্তরখান ৮ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন একটি মাঠে সাংবাদিকদের কথা হয়। পরিচয় গোপন রাখা এবং কোনো ধরনের রেকর্ড না করার শর্তে তাঁরা বিভিন্ন তথ্য দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেখানে মাদক কারবার, গ্রুপটির প্রভাব এবং পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর এক সদস্যের মুক্তি পাওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। কয়েকজন সদস্য দাবি করেন, অর্থের প্রভাবে অপরাধীরা আইনি প্রক্রিয়া থেকে সুবিধা পেতে পারে।
তবে পুলিশের বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেন বা অনিয়মের অভিযোগ গুরুতর বিষয়। সংশ্লিষ্ট অভিযোগের পক্ষে যাচাইযোগ্য নথি, নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য কিংবা তদন্তের ফলাফল ছাড়া তা প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। একইভাবে গ্রেপ্তার, মুক্তি বা জামিনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও আদালতের তথ্য যাচাই করা জরুরি।
প্রতিবেদনটিতে গ্রুপটির শীর্ষ নেতা হিসেবে বর্ণিত ব্যক্তির অতীত রাজনৈতিক পরিচয় এবং সাম্প্রতিক সময়ে নিজেকে রাজনৈতিকভাবে পরিচয় দেওয়া নিয়ে কয়েকজন সদস্যের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
তবে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়, পদ-পদবি বা কোনো সংগঠনের সঙ্গে বর্তমান সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নথি ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য প্রয়োজন। এ ধরনের বক্তব্যকে যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং, মাদক কারবার ও সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয়। এসব অভিযোগের কার্যকর তদন্ত, অপরাধে জড়িতদের শনাক্তকরণ এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান ও টঙ্গী এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
উপসংহার: ‘দে লাড়া’ গ্রুপ এবং ‘ভাবি’ নামে পরিচিত এক নারীকে ঘিরে প্রকাশিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রামাণ্য তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য নিশ্চিত করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য।