
নিজস্ব প্রতিবেদক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে ডাকাত চক্রের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দর ও রাজধানীর উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় অপরাধী চক্রগুলো ডাকাতির মতো অপরাধ সংঘটনে পেশাদার ও ভাড়াটে অপরাধীদের ব্যবহার করছে। এসব অপরাধের নেপথ্যে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলেও সরাসরি অপরাধে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
অভিযোগ রয়েছে, অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করে ঢাকার বাইরে চলে যায় চক্রের সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় তাদের কেউ কেউ গ্রেপ্তার হলেও পরবর্তী সময়ে জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং অপরাধ দমনের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিমানবন্দর থেকে ফেরার পথে যাত্রীদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ
বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে বাড়ি ফেরার পথে যাত্রীদের সঙ্গে থাকা মূল্যবান সামগ্রী, স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ রয়েছে অপরাধী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে। বিশেষ করে প্রবাসফেরত যাত্রী কিংবা বিদেশ থেকে আসা স্বজনদের পাঠানো মূল্যবান সামগ্রী বহনকারীরা অপরাধীদের নজরে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাপ্ত বর্ণনা অনুযায়ী, অপরাধীরা কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে যাত্রীদের গাড়িতে তুলে নেওয়ার কৌশল ব্যবহার করে। পরে নির্জন স্থানে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে বা হাত-পা বেঁধে সর্বস্ব লুট করে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার করা তদন্তসংশ্লিষ্টদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
ডিবি পুলিশ পরিচয়ে প্রবাসীর স্বর্ণালংকার ও মালামাল লুট
এ ধরনের অপরাধের একটি ঘটনায় চাঁদপুরের দক্ষিণ বালিয়া এলাকার সামাদ গাজী বাড়ির বাসিন্দা মো. খোরশেদের নাম উঠে এসেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ জুলাই তিনি দুবাইপ্রবাসী ভাইয়ের পাঠানো ১৭ ভরি স্বর্ণালংকারসহ অন্যান্য মালামাল নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। পথে রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় পৌঁছালে একদল ব্যক্তি নিজেদের গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয় দিয়ে তাঁকে একটি কালো গাড়িতে তুলে নেয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরে তাঁর চোখ ও হাত-পা বেঁধে স্বর্ণালংকারসহ অন্যান্য মালামাল লুট করা হয়। এরপর তাঁকে গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর এলাকায় ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা বলে বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। লুণ্ঠিত মালামালের আনুমানিক মূল্য ৩৮ লাখ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
ঘটনাটি বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফেরার পথে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে এ ঘটনায় মামলা, তদন্তের অগ্রগতি, অভিযুক্তদের পরিচয় কিংবা মালামাল উদ্ধারের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা অধরা থাকার অভিযো
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব অপরাধে সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হলেও অপরাধী চক্রের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
অভিযোগ রয়েছে, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের জামিনে মুক্ত করার জন্য এক শ্রেণির আইনজীবীর সঙ্গে আগে থেকেই যোগাযোগ বা চুক্তি থাকে। কিছু ক্ষেত্রে আইনজীবীরা তাৎক্ষণিক অর্থ গ্রহণ না করেও আইনি সহায়তা দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই, সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের বক্তব্য এবং নির্দিষ্ট কোনো মামলায় অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, আইনজীবীর মাধ্যমে আইনি সহায়তা নেওয়া বা আদালত থেকে জামিন পাওয়া নিজে কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
অপরাধ দমনে সমন্বিত উদ্যোগের গুরুত্ব
বিমানবন্দর, শাহবাগ, উত্তরা ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সন্দেহজনকভাবে পুলিশ পরিচয় দিয়ে কাউকে গাড়িতে তোলা, যাত্রীদের গতিবিধি অনুসরণ করা কিংবা নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়ার মতো অভিযোগ দ্রুত তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
অপরাধী চক্রের সদস্যদের পাশাপাশি তাদের অর্থদাতা, পরিকল্পনাকারী এবং সহযোগীদের শনাক্ত করা গেলে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সহজ হতে পারে। পাশাপাশি গ্রেপ্তার-পরবর্তী তদন্ত, আদালতের প্রক্রিয়া এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ।
যাত্রীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ
বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফেরার সময় যাত্রীদের পরিচয় যাচাই না করে অপরিচিত ব্যক্তির গাড়িতে না ওঠা, সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং বিশ্বস্ত পরিবহন ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কেউ পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয় দিলে পরিস্থিতি অনুযায়ী তাঁর পরিচয় ও দাপ্তরিক পরিচয়পত্র যাচাই করা এবং সন্দেহ হলে নিরাপদ স্থান থেকে সংশ্লিষ্ট থানায় বা জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা যেতে পারে।
বিমানবন্দরকেন্দ্রিক অপরাধের অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্তকরণ এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পাদনা-সংক্রান্ত নোট: প্রকাশের আগে ঘটনার সাল, মামলা নম্বর, সংশ্লিষ্ট থানার বক্তব্য, তদন্তকারী সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং অভিযোগের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করে যুক্ত করুন। যাচাই না হওয়া অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।