
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের শতাধিক নেতার বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তথ্য সংগ্রহ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এসব কার্যক্রমের সঙ্গে দেশের ভেতরে থাকা একটি সংগঠিত নেটওয়ার্কের পাশাপাশি দেশের বাইরে অবস্থানরত কয়েকজন ব্যক্তি ও সহযোগী চক্রের যোগাযোগ রয়েছে বলেও গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে দাবি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, গোয়েন্দাদের হাতে ইতোমধ্যে বেশ কিছু অডিও রেকর্ড, ডিজিটাল যোগাযোগের তথ্য এবং কথিত গোপন বৈঠকের সুনির্দিষ্ট তথ্য এসেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা ও যোগাযোগের ধরন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনার অভিযোগ
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা, ঝটিকা মিছিল, ককটেল নিক্ষেপ, যানবাহনে অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কেউ কেউ কাজ করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পেছনে অর্থায়ন, নির্দেশনা ও মাঠপর্যায়ে লোক সংগ্রহের বিষয়গুলোও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।
গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দেশের বাইরে অবস্থানরত কয়েকজন কথিত পরিকল্পনাকারীর সঙ্গে দেশের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের যোগাযোগের তথ্যও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। বিভিন্ন ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যমে তাদের মধ্যে যোগাযোগ এবং নির্দেশনা আদান-প্রদানের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অডিও রেকর্ড ও ডিজিটাল তথ্য যাচাই
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কথিত গোপন বৈঠক ও নাশকতার পরিকল্পনা নিয়ে বেশ কিছু অডিও রেকর্ড গোয়েন্দাদের হাতে এসেছে। এসব রেকর্ডের সত্যতা, কণ্ঠস্বর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাইয়ের কাজ চলছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যোগাযোগের তথ্যও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
গোয়েন্দারা মনে করছেন, কোনো একটি ঘটনার সঙ্গে কারা সরাসরি জড়িত এবং কারা নেপথ্য থেকে নির্দেশনা বা অর্থায়ন করেছে—তা আলাদা করে শনাক্ত করা প্রয়োজন। সে কারণে মাঠপর্যায়ের ঘটনাগুলোর পাশাপাশি নেপথ্যের যোগাযোগ ও অর্থের উৎস অনুসন্ধানেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
‘ন্যারেটিভ’ তৈরির অভিযোগ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বরাতে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন ও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে বিভিন্ন ধরনের ‘ন্যারেটিভ’ তৈরি করার চেষ্টা করছে বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে।
তাদের লক্ষ্য হচ্ছে—রাজপথের সহিংসতা, ঝটিকা মিছিল কিংবা অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলোকে নিজেদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড থেকে আলাদা করে দেখানো এবং একই সঙ্গে জনমনে নিজেদের ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে—এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করা।
তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি বিষয়ই তদন্ত ও প্রমাণের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
মাঠপর্যায়ে অর্থ ও বিস্ফোরক সরবরাহকারীদের খোঁজ
সূত্রের দাবি, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাসে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় মাঠপর্যায়ে অর্থ ও বিস্ফোরক সরবরাহকারীদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথ্য সংগ্রহ করেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, মাঠপর্যায়ে যারা সরাসরি অগ্নিসংযোগ বা ককটেল নিক্ষেপের মতো কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে, তাদের একটি অংশ অর্থের বিনিময়ে এসব কাজে যুক্ত হতে পারে।
কিশোর গ্যাং বা অপরাধপ্রবণ তরুণদের ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে জানা গেছে। অল্প টাকার বিনিময়ে তরুণদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড করিয়ে প্রকৃত পরিকল্পনাকারীরা আড়ালে থেকে যাচ্ছে কি না—এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নেপথ্যের নির্দেশদাতাদের শনাক্তে গুরুত্ব
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, কোনো নাশকতার ঘটনায় শুধু ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করলেই তদন্ত শেষ হয় না। এর পেছনে অর্থের উৎস, নির্দেশদাতা, পরিকল্পনাকারী এবং যোগাযোগকারীদের শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে বিভিন্ন ঘটনার পর গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি তাদের মোবাইল ফোন, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
দেশজুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি
নাশকতা প্রতিরোধে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্য মোতায়েনের কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
বিশেষ করে গণপরিবহন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, ব্যস্ত সড়ক, রাজনৈতিক কর্মসূচির সম্ভাব্য স্থান এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া কোনো এলাকায় সন্দেহজনক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে গোপন বৈঠক নিয়ে একাধিক অভিযান
এর আগে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কথিত গোপন বৈঠককে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। বসুন্ধরা এলাকায় কথিত গোপন বৈঠক ঘিরে ২২ জনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছিল।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের আগস্টে রাজধানীর গুলশানে কথিত গোপন বৈঠক থেকে আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ছয় নেতাকর্মী গ্রেপ্তারের খবর আসে।
সেপ্টেম্বরেও উত্তরখানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের কথিত গোপন বৈঠক থেকে আটজনকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়।
সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জনগণের জানমাল রক্ষা এবং দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বাসে অগ্নিসংযোগ, ককটেল নিক্ষেপ কিংবা যেকোনো ধরনের নাশকতার সঙ্গে জড়িতদের পাশাপাশি এসব কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে যাদের নাম এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যাবে না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জনগণকে গুজব বা যাচাইহীন তথ্যের ওপর নির্ভর না করে সন্দেহজনক কোনো কর্মকাণ্ড চোখে পড়লে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।