
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
গাজীপুরের শ্রীপুরে সংরক্ষিত বনের গাছ নিধনের মহোৎসবে এবার খোদ বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি ‘ঘুষ’ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রাজাবাড়ী এলাকার অবৈধ করাতকল মালিকের দাবি, রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিট কর্মকর্তাদের মোটা অংকের টাকা দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করেই বনের ভেতর এই অবৈধ কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল (রবিবার) রাজাবাড়ী এলাকায় এক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। করাতকল মালিক মো. মনির হোসেনের ভাষ্যমতে, ওইদিন রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা (রেঞ্জার) মোহাম্মদ জুয়েল রানা এবং সূর্যনারায়ণপুর বিট কর্মকর্তাসহ বন বিভাগের একটি দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
অভিযোগ উঠেছে, অভিযান চালানোর পরিবর্তে সেখানে দরকষাকষি শুরু হয়। মনির হোসেন সাংবাদিকদের জানান:
“ঘটনাস্থলেই রেঞ্জার জুয়েল রানাকে নগদ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ম্যানেজ করা হয়। এছাড়া তার সাথে থাকা বিট কর্মকর্তাদেরও আলাদাভাবে টাকা দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ওইদিন এক লক্ষ টাকা দেওয়ার পর রেঞ্জার ও বিট কর্মকর্তারা সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যান।”
এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ জুয়েল রানার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘুষের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তবে তার বক্তব্যে অসংলগ্নতা পাওয়া যায়। তিনি দাবি করেন, “গত রবিবারে আমি ঘটনাস্থলে যাইনি, আমাদের অন্য কর্মকর্তারা গিয়েছিলেন।” টাকার লেনদেনের প্রমাণ হিসেবে কোনো ভিডিও ফুটেজ আছে কিনা, তা নিয়ে উল্টো সাংবাদিকদের প্রশ্ন করেন তিনি। যদিও স-মিল মালিক নিজেই ক্যামেরার সামনে টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে, সূর্যনারায়ণপুর বিট কর্মকর্তার দাবি আরও বিচিত্র। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, “রবিবার কোনো বিট কর্মকর্তাই রাজাবাড়ী এলাকায় যাননি।” প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি বনের ভেতর কোনো ‘ভুতুড়ে’ অভিযান পরিচালিত হয়েছে? নাকি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আড়াল করতেই বিট কর্মকর্তা এই মিথ্যাচার করছেন?
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা মো. রহম আলী (পিতা: মৃত সায়েদ আলী)। ২০০৮ সালে বন্যপ্রাণী ও বন সংরক্ষণ আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা (নং ১৪৭/২০০৮) হলেও গত ১৮ বছরেও তার অবৈধ কর্মকাণ্ড থামেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, মনির হোসেন ও রহম আলীদের মতো প্রভাবশালীরা বন বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাসোহারা ও তাৎক্ষণিক মোটা অংকের টাকা দিয়ে বনের গজারী গাছ উজাড় করছেন।
প্রকাশ্য দিবালোকে ২-৩ গাড়ি গজারী গাছ কেটে এই স-মিলে চিরাই করা হচ্ছে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং সরাসরি ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। সচেতন নাগরিকদের দাবি, যেখানে বন রক্ষাকারীরাই ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছেন, সেখানে সাধারণ মানুষের আস্থা রাখার আর কোনো জায়গা নেই।
আইনের তোয়াক্কা না করে এবং আদালতের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই অবৈধ করাতকলগুলো কীভাবে টিকে আছে, তার জবাব এখন সময়ের দাবি। ঢাকা বন বিভাগের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কি এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, নাকি টাকার বিনিময়ে শ্রীপুরের বন মানচিত্র থেকে মুছে যাবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।