
উত্তরবঙ্গের কৃষি, মাটি ও পানির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। প্রায় ১৫ লাখেরও বেশি কৃষক পরিবার বর্তমানে এই সরকারি সংস্থাটির সরাসরি সুবিধাভোগী। স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের মতে, মানুষ, মাটি ও পানির এই মেলবন্ধন বজায় থাকলে উত্তরবঙ্গের প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আরও সুসংহত হবে। নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জাব্বার (৭০) বলেন, “বিএমডিএ উত্তরবঙ্গের কৃষিচিত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। গভীর নলকূপ, খাল খনন, সুপেয় পানি সরবরাহ ও সোলার প্যানেলের মতো বহুমুখী উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানটি এলাকাকে সমৃদ্ধ করেছে। কৃষি ও পানির টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য বিএমডিএ-র ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত রাখা প্রয়োজন।
মরুময়তা জয় করে শস্য ভাণ্ডারে রূপান্তর: ১৯৮৫ সালে বরেন্দ্র প্রকল্পের যাত্রা শুরু হলেও ১৯৯১-৯২ অর্থবছর থেকে এটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পূর্ণাঙ্গ সংস্থা হিসেবে কাজ শুরু করে। এক সময়ের শুষ্ক ও খরাপীড়িত এই অঞ্চল আজ দেশের অন্যতম প্রধান শস্য ভাণ্ডার। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল ও গোমস্তাপুরের বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন ভোরে পানীয় জল থেকে শুরু করে চাষাবাদের সেচ পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে তারা বিএমডিএ-র ওপর নির্ভরশীল। পরিসংখ্যানে বিএমডিএ-র সাফল্য: চাঁপাইনবাবগঞ্জ রিজিয়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটি মরুপ্রায় জমিকে সেচের আওতায় আনতে ১৬৩৯টি ফোর্স মোড পাম্প স্থাপন করেছে। ফলে আগে যেখানে বছরে একটি ফসল হতো, এখন সেখানে প্রায় ৬২ হাজার হেক্টর জমিতে বছরে তিনটি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। এতে উপকৃত হচ্ছেন প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কৃষক পরিবার।
কেবল ভূ-গর্ভস্থ পানি নয়, মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর পানি ব্যবহারের জন্য ৮৮টি এলএলপি (LLP) পাম্পের মাধ্যমে প্রতিবছর আরও ৩ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করা হচ্ছে। বিএমডিএ-র সেচ ব্যবস্থাপনায় প্রতি বছর উৎপাদিত প্রায় ৬.৫০ লক্ষ মেট্রিক টন ফসলের আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ১৬২৫ কোটি টাকা। সেচ কাজে পানির অপচয় রোধে এবং বিল পরিশোধ সহজ করতে সংস্থাটি কৃষি খাতে প্রথম স্মার্ট কার্ড ভিত্তিক প্রিপেইড মিটার চালু করেছে, যা সারা দেশে প্রশংসিত হয়েছে। পরিবেশ রক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়ন: বরেন্দ্র এলাকায় মরুময়তা রোধে এ পর্যন্ত প্রায় ১.৫০ কোটি ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে পুনঃখনন করা হয়েছে ২.৩০ কি.মি. খাস খাল এবং ১০৯১টি পুকুর। এছাড়া: সুপেয় পানি: ২৩৪টি প্ল্যান্টের মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ মানুষের বিশুদ্ধ খাবার পানি নিশ্চিত করা হয়েছে। যোগাযোগ: কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের সুবিধার্থে ১৮৬ কি.মি. সংযোগ পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। আধুনিক সেচ: ফলন বাড়াতে এবং পানির অপচয় রোধে উঁচু এলাকার আম বাগানগুলোতে ‘ড্রিপ ইরিগেশন’ বা ফোঁটা ফোঁটা সেচ পদ্ধতি জনপ্রিয় করা হচ্ছে।
আসছে বিশাল দুই প্রকল্প:
বিএমডিএ-র চাঁপাইনবাবগঞ্জ রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আল মামুনুর রশীদ জানান, মহানন্দা নদীর পানি ব্যবহারের মাধ্যমে খরাপ্রবণ এলাকায় সেচ সুবিধা পৌঁছে দিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ে দুটি বড় প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ১. ডাবল লিফটিং পদ্ধতি: ৮৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে মহানন্দা নদীর পানি সেচ ও পরিবেশ উন্নয়নে ব্যবহার। ২. জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা প্রকল্প: ৫৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে খরাপ্রবণ এলাকায় সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ।
এই প্রকল্পগুলোর আওতায় ২১০ কি.মি. খাল ও ১৫০টি পুকুর পুনঃখনন এবং ৫.৫০ লক্ষ বৃক্ষ রোপণ করা হবে। বর্তমানে সংস্থাটি মোট ২৬৬১ কি.মি. খাল, ১০টি বিল এবং ৪ হাজার ৩৬৪টি পুকুর পুনঃখননের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিএমডিএ-কে আরও শক্তিশালী করা হলে উত্তরবঙ্গের আর্থ-সামাজিক চিত্র আমূল বদলে যাবে এবং দেশ কৃষি উৎপাদনে আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে।