
অনলাইন জুয়ার ফাঁদে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন গ্রামগঞ্জের মানুষ, বাড়ছে সামাজিক বিপর্যয়।
মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ঢাকা জেলা প্রতিনিধি।
সারা বাংলাদেশ রাজধানীর ও জেলা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জের এলাকাগুলোতে একখ এক নীরব মহামারী গ্রার্স করেছে। যে শান্ত-সবুজ গ্রামগুলো চিরকাল শান্তিনিষ্ঠা আর কৃষির জন্য পরিচিত ছিল, সেখানে এখন মরণ কামড় বসিয়েছে অনলাইন জুয়া বা ডিজিটাল বেটিং। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও প্রত্যন্ত গ্রামের তরুন থেকে শুরু করে দিনমজুর, এমনকি স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুদ হয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। দ্রুত বড় লোক হওয়ার চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো পরিবার, বিঘ্নিত হচ্ছে গ্রামীণ সামাজিক স্থিতিশীলতা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে ও এ জুয়ার জাল ছড়িয়ে পড়েছে। চায়ের দোকান,বাজারের কোণ কিংবা পানের দোকানে বসে,ছাত্র ছাত্রী সহ সকলেই দলবেঁধে তরুণদের মোবাইলে মগ্ন থাকার দৃশ্য এখন নিত্যদিনের। জনপ্রিয় ফুটবল বা ক্রিকেট টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে বিদেশি বিভিন্ন বেটিং অ্যাপ ও সাইটে বাজি ধরছে তারা।সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, স্হানীয় কিছু অসাধু বিকাশ,রকেট বা নগদ এজেন্ট এই জুয়ার টাকা লেনদেনের ক্যাশ ইন ও ক্যাশ আউট-এর মাধ্যমে হিসেবে কাজ করছে,যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও সহজলভ্য করে তুলেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষি, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত এই টাকা জুয়ার সাইটে ঢালছেন স্হানীয় মেহনতি মানুষ। প্রথম দিকে সামান্য কিছু টাকা জিতিয়ে লোভের সাগরে ভাসানো হয়, আর পরবর্তীতে সেই টাকা তুলতে গিয়ে একে একে জমি বন্ধক,হালের গরু বিক্রি, এমনকি চড়া সুদে দাদন নিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।
বিভিন্ন টমটম ও ভ্যান চালকগণ প্রতিদিন টমটম ও ভ্যান চালিয়ে ১৫০০/১৬০০ টাকা আয় করেন, যা দিয়ে সংস্বার ভালোভাবেই চলতো। একদিন এক বন্ধুকে দেখি ১০ মিনিটে ১০০ টাকার বিনিময়ে ১০ হাজার টাকা জিতলো। এটা দেখে লোভে পড়ে আমার আর এক বন্ধু জুয়া খেলতে শুরু করে।এখন ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
এছাড়াও,একাধিক গ্রামের ভুক্তভোগী পরিবার জানায়,জুয়ার টাকার জন্য ঘড়ে ঘড়ে অশান্তি, স্বামী-স্ত্রীর বিবাহবিচ্ছেদ এবং পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়েছে।
ঋণের বোঝা সইতে না পেরে অনেক তরুণ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
অনলাইন জুয়ার এই আগ্রাসনের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সারা বাংলাদেশে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে এলাকায় চুরি,ছিনতাই এবং মাদক ব্যবসার মতো অপরাধ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। উঠতি বয়সী কিশোর ও যুবকেরা জরিয়ে পড়ছে নানা গ্যাং কালচার।স্হানীয় সচেতন মহলের মতে,এই মরণনেশা রুখতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক চরম অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।
প্রতিটি এলাকায় স্হানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের বক্তব্যঃ–
এ বিষয়ে প্রতিটি জেলা উপজেলা অনলাইন জুয়া বর্তমানে সমাজের জন্য একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এটি তরুণ সমাজকে বিপদগামী করার পাশাপাশি অনেক পরিবারকে অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
অনলাইন জুয়া প্রতিরোধ স্হানীয় ও ইউনিয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, মসজিদের ইমাম,জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সচেতনতা মূলক সভা-সেমিনার আয়োজন করা উচিৎ। একই সঙ্গে যুবসমাজকে এ বিষয়ে সচেতন করতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো উচিৎ। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই সামাজিক ব্যাধি প্রতিরোধ করা সম্ভব। এছাড়াও, সমাজসেবক ও শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এই অদৃশ্য জুয়া বন্ধ করা সম্ভব নয়।এর জন্য দরকার প্রতিটি গ্রামে ব্যাপক সামাজিক প্রতিরোধ। জুয়ার ক্ষতিকর দিক নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে আলোচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে পুলিশ প্রশাসন ও সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে স্হানীয় জুয়ার ডিলার এবং অবৈধ লেনদেন জড়িত মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন এলাকাবাসী ও জেলা ও উপজেলাবাসী।