
টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায় নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ চার দিন পর আমিনুল ইসলাম খান মিন্টু (৩০) নামের এক যুবকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার (৩ জুন) রাত সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার সংগ্রামপুর ইউনিয়নের কাউটেনগর মাছুয়া বিলের একটি পানিশূন্য স্থান থেকে তার লাশটি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকালে নিহতের মরদেহটি অত্যন্ত চতুরতার সাথে কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে পুলিশ, নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের ধারণা, এটি একটি সুপরিকল্পিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড। এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইতোমধ্যে ৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
নিহত আমিনুল ইসলাম মিন্টু উপজেলার সংগ্রামপুর ইউনিয়নের ছনখোলা আমুয়াবাইদ এলাকার অত্যন্ত পরিচিত মুখ, স্থানীয় আব্দুল মজিদ মাস্টারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। তিনি জীবিকার তাগিদে গাজীপুরের টঙ্গী পাগার এলাকায় অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠান ‘জাবের অ্যান্ড জোবায়ের ফেব্রিক্স লিমিটেড’ কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি কাটাতে এবং পরিবারের সাথে আনন্দের মুহূর্ত ভাগ করে নিতে কয়েক দিন আগে তিনি গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন। কিন্তু সেই আনন্দের ছুটি যে তাঁর জীবনের শেষ ছুটি হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
নিহত মিন্টুর পরিবার স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁর বড় ভাই আলহাজ্ব আব্দুল মান্নান সংগ্রামপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে এলাকায় তাঁদের পরিবারের একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ মে (রোববার) রাত থেকে হঠাৎ করেই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন আমিনুল ইসলাম মিন্টু। রাতের পর রাত কেটে গেলেও তিনি আর বাড়িতে ফিরে আসেননি। নিখোঁজের পর থেকেই তাঁর ব্যবহৃত ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটিও সম্পূর্ণ বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। কোনো উপায় না দেখে পরিবারের সদস্যরা আত্মীয়-স্বজনসহ সম্ভাব্য সব স্থানে দিনরাত খোঁজাখুঁজি করেও মিন্টুর কোনো হদিস মেলাতে পারেননি। পুরো পরিবারে নেমে আসে চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা।
অবশেষে নিখোঁজের চার দিন পর, বুধবার রাতে কাউটেনগর মাছুয়া বিল এলাকার সাধারণ মানুষ বিলের একটি পানিশূন্য প্রায় খালের মধ্যে স্তূপাকারে রাখা কচুরিপানা দেখতে পান। সেখান থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। এরপর কচুরিপানা একটু সরাতেই মানুষের পা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে এই খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং শত শত উৎসুক জনতা বিলের পাড়ে ভিড় জমায়। খবর পেয়ে ঘাটাইল থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে।
রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘাটাইল থানা পুলিশ মাছুয়া বিলের ওই পানিশূন্য খালের তলদেশ থেকে কচুরিপানা সরিয়ে আমিনুল ইসলাম মিন্টুর লাশটি উদ্ধার করে। চার দিন ধরে জল-কাদায় ঢেকে থাকায় লাশের শরীরে পচন ধরতে শুরু করেছিল। পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত শেষে নিহতের মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করে। পুলিশের ধারণা, খুনিরা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় মিন্টুকে শ্বাসরোধ করে বা আঘাত করে হত্যার পর লাশটি চিরতরে গুম করার উদ্দেশ্যে এই জনমানবহীন বিলের খাদের মধ্যে কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে রেখেছিল।
নিহত মিন্টুর বড় ভাই এবং স্থানীয় বিএনপি নেতা আব্দুল মান্নান এই ঘটনাকে একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ ও কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে গণমাধ্যমকে বলেন, “আমার ভাইয়ের সাথে কারও কোনো শত্রুতা ছিল না। সে গাজীপুরে চাকরি করত, ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসেছিল। দুর্বৃত্তরা সুপরিকল্পিতভাবে মোবাইল ফোনে বা অন্য কোনো উপায়ে তাকে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, লাশ যেন কেউ কোনো দিন খুঁজে না পায়, সেজন্য কচুরিপানা দিয়ে বিলের মধ্যে গুম করার চেষ্টা করেছিল। আমি আমার নির্দোষ ভাই হত্যার সাথে জড়িত মূল হোতাদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং আদালতে তাদের দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি।” এলাকাটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো নেপথ্য কারণ বা গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে কিনা, তা নিয়েও স্থানীয়দের মাঝে নানা গুঞ্জন চলছে।
হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে তৎপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঘাটাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোকছেদুর রহমান গণমাধ্যমকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “আমরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির (Call Details Record – CDR) সর্বোচ্চ সহায়তায় জানতে পারি যে, কাউটেনগর মাছুয়া বিলের মধ্যে একটি লাশ পড়ে আছে। পরে পুলিশ গিয়ে কচুরিপানা দিয়ে ঢাকা অবস্থায় নিখোঁজ মিন্টুর মরদেহটি উদ্ধার করে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসকদের ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আমরা শতভাগ নিশ্চিত হতে পারব।”
ওসি আরও জানান, “এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন এবং ঘটনার নেপথ্যের কারণ খোঁজার জন্য আমরা ইতোমধ্যে স্থানীয় পাঁচজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করেছি। তাদেরকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এবং এই চক্রের অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারের সুবিধার্থে এই মুহূর্তে আটককৃতদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।” এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে ঘাটাইল থানায় একটি নিয়মিত হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে বলেও তিনি জানান।