
ঢাকার আশুলিয়ায় চুরির মিথ্যা অপবাদ, নির্মম শারীরিক নির্যাতন এবং সালিশের নামে লোকসমক্ষে চরম অপমান সহ্য করতে না পেরে আল আমিন (২৬) নামের এক যুবক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। গত মঙ্গলবার (৯ জুন ২০২৬) দুপুর ১টার দিকে আশুলিয়ার জামগড়া উত্তরপাড়া এলাকার শরীফ মার্কেটে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। নিহত আল আমিনের মরদেহ বর্তমানে সাভারের শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে হাসপাতালে রাখা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এলাকায় চরম উত্তেজনা ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নির্মম নির্যাতন: নিহত আল আমিন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানার দেওয়ান তারুটিয়া গ্রামের আলম সরকারের ছেলে। তিনি বিবাহিত ছিলেন এবং জীবিকার তাগিদে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় সস্ত্রীক বসবাস করতেন। স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার আল আমিনের বিরুদ্ধে একটি মোবাইল ফোন এবং কিছু টাকা চুরির মিথ্যা অপবাদ আনা হয়। কোনো প্রকার প্রমাণ ছাড়াই এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বাড়িওয়ালা কামাল, তানভীর, বিপ্লব, এবং সুমনসহ অজ্ঞাত আরও ১০-১২ জন অসাধু ব্যক্তি আল আমিনকে ধরে নিয়ে যায়।
তাকে জামগড়া উত্তরপাড়া এলাকার একটি স্থানীয় রিকশা গ্যারেজে আটকে রেখে নির্মমভাবে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আল আমিন বারবার নিজেকে নিরপরাধ বলে দাবি করলেও নির্যাতনকারীরা তার কোনো কথাই শোনেনি। বরং পৈশাচিক কায়দায় তাকে লাঠিসোটা ও রড দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।
প্রহসনের সালিশ ও অর্থদণ্ড: শারীরিক নির্যাতনের পর সেখানেই ক্ষান্ত হয়নি অভিযুক্তরা। এরপর স্থানীয়ভাবে একটি প্রহসনের সালিশের আয়োজন করা হয়। সেই সালিশে আল আমিনকে চোর সাব্যস্ত করে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং বিষয়টি কাউকে না জানিয়ে মুখ বন্ধ রাখার জন্য চরম চাপ প্রয়োগ করা হয়। একজন সাধারণ শ্রমজীবী যুবকের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে এত টাকা পরিশোধ করা অসম্ভব ছিল। ফলে সালিশের পর থেকেই আল আমিন চরম মানসিক ট্রমা ও বিষণ্নতায় ভুগছিলেন।
পুনরায় অপমান ও আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া: এলাকাবাসী ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, চুরির অপবাদ দিয়ে নির্মম নির্যাতন করার পরও ক্ষান্ত হয়নি প্রভাবশালীরা। ঘটনার পরের দিন, অর্থাৎ ৯ জুন সকালে অভিযুক্তরা পুনরায় আল আমিনের বাসায় এসে তাকে ও তার পরিবারকে লোকসমক্ষে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। চুরির এই মিথ্যা কলঙ্ক, শারীরিক নির্যাতনের তীব্র ব্যথা এবং সমাজের মানুষের সামনে বারবার অপমানিত হওয়ার এই ধকল ও মানসিক যন্ত্রণা আর সহ্য করতে পারেননি আল আমিন।
তীব্র ক্ষোভ, অভিমান ও আত্মসম্মান রক্ষার্থে ওই দিন দুপুর ১টার দিকে আল আমিন নিজের ঘরের বাথরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন এবং গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। বেশ কিছু সময় পার হওয়ার পরও তিনি বাথরুম থেকে বের না হওয়ায় পরিবারের লোকজন দরজা ভেঙে তার ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান। দুপুরে এই আত্মহত্যার খবর জানাজানি হলে পুরো জামগড়া এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন।
এলাকাবাসীর তীব্র ক্ষোভ ও বিচার দাবি: এই অমানবিক ঘটনায় জামগড়া এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একজন মানুষকে এভাবে কোনো প্রমাণ ছাড়াই চোর অপবাদ দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা এবং জনসমক্ষে অপমান করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের সমাজে কি কোনো আইন-কানুন নেই? এই অপমানের তীব্র যন্ত্রণা থেকেই ছেলেটি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। আমরা এই বর্বরোচিত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
নির্বাক পরিবার, চান না মামলা: নিহত আল আমিনের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাদের কান্না ও আহাজারিতে আশপাশের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। তবে চরম ক্ষোভ, হতাশা ও বিচারহীনতার ভয় থেকে তারা কোনো প্রকার আইনি ঝামেলা বা মামলা-মোকদ্দমায় জড়াতে চাচ্ছেন না।
নিহত আল আমিনের বাবা অশ্রুভেজা কণ্ঠে এবং ক্ষোভের সাথে বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। গরিব মানুষের কোনো বিচার এই দেশে নাই, কোনোদিন পাইও না। মামলা-হৈচৈ কইরা কি হইবে? আমার কোল খালি হইছে, আমার পোলাতো আর কোনোদিন ফেরত আইবো না। মামলা করলে উল্টো আমাগো আরও হয়রানি হইতে হইবে।” বাবার এমন অসহায় মন্তব্য গ্রামীণ ও শ্রমজীবী মানুষের বিচার ব্যবস্থার প্রতি চরম অনাস্থার চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
পুলিশের পদক্ষেপ ও অভিযুক্তদের পলায়ন: ঘটনার খবর পেয়ে জামগড়া পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (এসআই) মোঃ রাশেদুজ্জামান এবং (এসআই) মোঃ তালেব দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তারা মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। পুলিশ হাসপাতাল থেকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। চুরির অপবাদে পিটিয়ে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়া সেই প্রভাবশালী বাড়িওয়ালা কামাল, তানভীর, বিপ্লব এবং সুমনসহ মামলার প্রধান অভিযুক্তরা বর্তমানে এলাকা ছেড়ে পলাতক রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।