
অনিয়ম-দুর্নীতি আড়াল করতে মনগড়া কমিটি গঠনের অভিযোগ প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে
এম মাহফুজার রহমান
উপজেলা, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা)
১৫/০৭/২৬
হামার কাছে ল্যাপটিন (টয়লেট) সাফ করি নেয়, ঘর ঝাড়ু দিয়া নেয়, আরও ফিল্ডির ঘাস উকরি নেয়। না করলে গাইল পাড়ে আর কয় অন্যান্য স্কুলের ছাওয়ারা না উগলা করে তোমরা ক্যা পান না। কথাগুলো বলছিলেন শিশু শিক্ষার্থী মোছাঃ ফারিয়া আক্তার।
সে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শান্তিরাম ইউনিয়নের চাদপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।
আর এ ধরনের অভিযোগ কেবলি তার একার নয়, বরং ওই বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষার্থীদেরও।
কথা হয় তৃতীয় শ্রেণীর আরেক শিক্ষার্থী মো. নাজমুল মিয়ার সাথে।
সে বলে “ম্যাডামেরা আইসে আর অল্পে এ্যাকনা করি ক্লাশ নিয়া বলে তোমরা পড়ো। আর ওমরা মোবাইল দেখেন। সময় শেষ হলে চলে যান। কোনোদিন করি হামাক কয় তোমরা খেলান। কয়া ওমরা ভাত খায়, আর পড়ায় না।”
শিশু শিক্ষার্থী আরও বলে, হামাক কয় ল্যাপ্টিন সাফ কইরবার। হামরা যদি কই পাবাননই, তখন হামাক ধরি ডাংগায়। স্কুলের সবাইক দিয়া কাম করান বলেও জানান ওই শিক্ষার্থী।”
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোছাঃ সুমাইয়া আক্তারের মা মোছাঃ জেলেখা বেগম ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, “বাচ্চা স্কুলে পাঠে দেই পড়াশোনা করার জন্য। তাক ওমরা ঘাস তুলি নেয়, ল্যাট্রিন পরিস্কার করি নেয়। না করলে কয় এইগলা না করলে স্কুল থাকি বাইর হয়া যাও। এইগলা না কইরবেন তাহলে কি জন্যে স্কুলোত আইসেন? তাও যদি না করি দেয় তাহলে মাতাত চড়ায়। কথাগুলো যখন বাচ্চাদের কাছে শুনি তখন খুব কষ্ট হয় আমাদের। ওই স্কুলে বাচ্চাকে তিনি আর পড়াবেন না বলেও জানান।”
স্থানীয় মো. মাহবুব মিয়া () বলেন, এই স্কুলে লেখাপড়ার মান একেবারেই জঘন্য। স্কুল মিলে পঁচিশ থেকে ছাব্বিশ জন শিক্ষার্থী। বই উত্তোলন করেন একশো থেকে দেড়শো সেট। পরে সেগুলো ভাংগারীর কাছে বিক্রি করে খায়। সরকারি বরাদ্দে দুইটা আলমিরা, পাঁচটা টেবিল এবং পাঁচটা চেয়ার এসেছিলো। সেগুলো হেড মাষ্টার তার বাসায় রেখেছেন।
তিনি আরও বলেন, “বিগত সময়ে তাদের নিজেদের মধ্যে কমিটি গঠন করে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছেন। এবারেও পকেট কমিটি গঠনের পাঁয়তারা করছেন তারা। আমি মনোনয়ন ফরম কিনতে গিয়েছিলাম। হেড মাষ্টার বলেন ৩ হাজার টাকা দিয়ে ফরম কেনার লোক এখানে নেই। সে কারণে সিলেকশন করেছি। পরে আমি প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে গিয়ে অভিযোগ দেই। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কি না বিষয়টি জানি না।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, তাঁদের দাবি, বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এসব শিশু শিক্ষার্থীদের দিয়ে টয়লেট, শ্রেণিকক্ষ ও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করানো হয়। নিয়মিত পাঠদানও হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পড়তে দিয়ে শিক্ষকরা মোবাইল ফোন ব্যবহারে ব্যস্ত থাকেন বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। এছাড়া বিদ্যালয়ের আলমারি, ল্যাপটপ, প্রজেক্টরসহ বিভিন্ন শিক্ষা-উপকরণ বিদ্যালয়ে না রেখে প্রধান শিক্ষকের বসতবাড়িতে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তাদের দাবি, নিজের অপকর্ম আড়াল করতেই তারা বার-বার পকেট কমিটি করেন। তারই ধারাবাহিকতায় এবারেও নিজেদের মধ্যে কমিটি করার পাঁয়তারা করছেন প্রতিষ্ঠান প্রধান।
গত গত ১২ জুলাই (রোববার) আনুমানিক দুপুর ২টার দিকে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের নিচতলার একটি শ্রেণিকক্ষে ২ জন শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন এক শিক্ষক। পরে সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠে দেখা যায় আরেকটি শ্রেণিকক্ষে ৪ শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন আরেকজন শিক্ষক। অর্থাৎ পুরো বিদ্যালয়ে তখন মাত্র ছয়জন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখা গেছে।
এ বিষয়ে কথা হয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আইনুরন্নাহার বেগমের সাথে। তিনি বলেন, ১২০ জন শিক্ষার্থী আছে। তাঁদের দিয়ে বিদ্যালয়ের কোনো কাজ করানো হয় না। ল্যাপটপ ও প্রজেক্টরসহ কোনো আসবাবপত্র বাসায় নেয়া হয়নি।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত ২৯ জুন শান্তিরাম ক্লাস্টারে তফসিল ঘোষণা করা হয়। মাইকিং করে বলা হয় দুই তারিখের মধ্যে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে। নির্ধারিত তারিখের মধ্যে কেউ সংগ্রহ করেনননি। সে কারণে কমিটির কাজ এ অবস্থায় আটকে আছে। এটিও স্যারের নির্দেশনা মোতাবেক পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
এ বিষয়ে কথা হয় ওই ক্লাস্টারের দায়িত্বে থাকা উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলামের সাথে। পকেট কমিটি করার কোনো সুযোগ নেই বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, আমরা মাইকিং করেছিলাম ২৯ তারিখে। তবে একটা মনোনয়ন ফরমও বিক্রি হয়নি। আবারও তারিখ নির্ধারণ করে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করতে মাইকিং করার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন এ কর্মকর্তা।”
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সত্যি বলতে কি এখন পর্যন্ত ওই স্কুলে একদিনও যাওয়া হয়নি।”
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুর মোহাম্মদ বলেন, লিখিত অভিযোগ ছাড়া শুধুমাত্র মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষ্মণ কুমার দাশের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।