
ভূরুঙ্গামারীতে বিদ্যুতের ‘লুকোচুরি’, ২৪ ঘণ্টায় মিলছে না ৮ ঘণ্টাও—চরম ভোগান্তিতে মানুষ।
আব্দুল ওয়াহাব, স্টাফ রিপোর্টার, কুড়িগ্রাম।
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় তীব্র গরমের মধ্যে অসহনীয় হয়ে উঠেছে বিদ্যুৎ সংকট। দিন-রাত মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টায় অনেক এলাকায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ মিলছে না বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকেরা। দীর্ঘ সময়ের এই লোডশেডিংয়ে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অনলাইনভিত্তিক নানা কার্যক্রম।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কখন বিদ্যুৎ আসবে আর কখন চলে যাবে—তার কোনো নির্দিষ্ট হিসাব নেই। দিনের বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি গভীর রাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। ফলে প্রচণ্ড গরমে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১২ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। কখনো বিদ্যুৎ আসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবার চলে যাচ্ছে। এতে ঘরোয়া কাজের পাশাপাশি বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও নেমে এসেছে স্থবিরতা।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কম্পিউটার ও ফটোকপি দোকান, সেলুন, ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন বিদ্যুৎনির্ভর প্রতিষ্ঠানের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে যন্ত্রপাতি সচল রাখা এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুতের অভাবে রাতের ঘুমও বিঘ্নিত হচ্ছে অনেক পরিবারের। ঘরে বৈদ্যুতিক পাখা কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকায় সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। গরমে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে পরিবারের সদস্যদের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপরও। বিশেষ করে রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পরীক্ষার প্রস্তুতি ও নিয়মিত পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। বিদ্যুৎনির্ভর আলো ব্যবহার করতে না পারায় অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে পড়াশোনার সময়সূচি পরিবর্তন করছে।
একই সঙ্গে ইন্টারনেটনির্ভর কাজ, ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ব্যক্তিরা সমস্যায় পড়েছেন। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ইন্টারনেট সংযোগ ও কম্পিউটারনির্ভর কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে কাজের সময়সীমা ঠিক রাখা এবং ক্লায়েন্টের নির্ধারিত সময়ে কাজ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় কোথাও কোথাও পানির মোটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে বাসাবাড়িতে পানি তোলার সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার মোটরের ওপর নির্ভরশীল, তাদের বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহেও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করার পরও যদি দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে টানা লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে।
তাদের দাবি, দ্রুত লোডশেডিং কমিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কুড়িগ্রাম জেলা শাখার এজিএম জানান, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় কুড়িগ্রাম জেলার সব উপজেলাতেই এর প্রভাব পড়েছে। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হলে কুড়িগ্রামেও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে জানান তিনি।
এদিকে ভূরুঙ্গামারীর বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে দ্রুত লোডশেডিং কমানো হবে। তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীনতার এই দুর্ভোগ থেকে দ্রুত মুক্তি চান তারা।