
আল-কায়েদার ঘাঁটির ট্যাগ: পার্বত্য চট্টগ্রাম কি নতুন ভূরাজনৈতিক দাবার ছক? – আইনজীবী জিয়াবুল আলম।
বেলাল উদ্দিন
টেকনাফ প্রতিনিধি:
বাংলাদেশে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট—AQIS-এর সম্ভাব্য তৎপরতা নিয়ে আন্তর্জাতিক সতর্কতা নিঃসন্দেহে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। কিন্তু বিষয়টিকে শুধু জঙ্গিবাদ বা আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের সামনে থাকা বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাটি আড়ালে থেকে যায়। প্রশ্নটি তাই আরও বড়—বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব ভূখণ্ড কি ভারত–মিয়ানমার–চীন–যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত কৌশলগত প্রতিযোগিতায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে? প্রথমেই একটি পার্থক্য জরুরি। বাংলাদেশে আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠিত ঘাঁটি রয়েছে—এমন দাবি এবং AQIS বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সম্ভাব্য সেল বা নেটওয়ার্ক গঠনের চেষ্টা করছে—এমন মূল্যায়ন এক নয়। প্রমাণিত উপস্থিতি আর সম্ভাব্য হুমকিকে এক করে দেখা তথ্যগতভাবে ভুল। কিন্তু কোনো দেশের নাম যখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা-বয়ানে ‘সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য ক্ষেত্র’ হিসেবে যুক্ত হয়, তখন তার রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অভিঘাতও বিবেচনায় নিতে হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম এই আলোচনাকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলের আয়তন প্রায় ১৩,১৮১ বর্গকিলোমিটার, যা বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশ। এর উত্তরে ও পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম এবং মিয়ানমারের চিন ও রাখাইন অঞ্চল। ফলে এটি শুধু বাংলাদেশের একটি পাহাড়ি সীমান্ত নয়; এখানে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের নিরাপত্তা-ভূগোল পরস্পরকে স্পর্শ করেছে। মিয়ানমারের বর্তমান সংঘাত, রাখাইন ও চিন অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা, সীমান্তে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা, রোহিঙ্গা সংকট, অস্ত্র-মাদকপাচার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ এই অঞ্চলকে আরও সংবেদনশীল করেছে। কোনো আন্তঃদেশীয় জঙ্গি সংগঠন যদি এমন পরিবেশকে কাজে লাগাতে চায়, তার অভিঘাত বাংলাদেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; ভারতীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমারের সংঘাত এবং বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তার সঙ্গেও তা যুক্ত হতে পারে।
তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা—পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনৈতিক বা সশস্ত্র সংগঠন এবং AQIS-এর মতো বৈশ্বিক জিহাদি সংগঠনকে এক করে দেখা যাবে না। তাদের ইতিহাস, লক্ষ্য, আদর্শ ও সাংগঠনিক কাঠামো ভিন্ন। স্থানীয় রাজনৈতিক বা জাতিগত প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক জিহাদি সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে একাকার করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি সম্ভাব্য আন্তঃদেশীয় জঙ্গি ঝুঁকি অস্বীকার করাও দায়িত্বশীল অবস্থান নয়।
ভারতের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের গুরুত্ব মূলত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা-সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীনের কৌশলগত স্বার্থ। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এখন শুধু বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ নয়; এটি ভারত মহাসাগরীয় ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। BIISS-এর গবেষণা অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরের আয়তন প্রায় ২১.৭৩ লাখ বর্গকিলোমিটার এবং বৈশ্বিক কনটেইনার বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেক এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। চীন তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতি বাড়াচ্ছে; ভারত বঙ্গোপসাগরকে নিজের নিকটবর্তী সামুদ্রিক নিরাপত্তা-পরিসর হিসেবে দেখে; যুক্তরাষ্ট্রের Indo-Pacific strategy-তেও এ অঞ্চলের গুরুত্ব রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এমন একটি ভূগোলে অবস্থান করছে, যেখানে বড় শক্তিগুলোর স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে এসে মিলেছে।
এখন প্রশ্ন—‘আল-কায়েদার ঘাঁটি’ ধরনের ট্যাগ কি ভবিষ্যতে কোনো বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বয়ানের ভিত্তি হতে পারে? এটিকে এখনই বাস্তব পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা যাবে না। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো অঞ্চলকে ‘সন্ত্রাসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করার পর সেখানে আন্তর্জাতিক নজরদারি, নিরাপত্তা সহযোগিতা, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং কূটনৈতিক আগ্রহ বাড়তে পারে। এখানেই সম্ভাব্য ঝুঁকি। স্থানীয় রাজনৈতিক সমস্যা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ যদি একই নিরাপত্তা-বয়ানে ঢুকে যায়, তাহলে একটি অভ্যন্তরীণ সমস্যা ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিকীকরণ হতে পারে।
জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়েও তাই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান প্রয়োজন। জাতিসংঘ বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র করছে—এমন দাবি করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া তা বলা ঠিক হবে না। AQIS-এর মতো সংগঠনের সক্ষমতা ও সম্ভাব্য বিস্তার পর্যবেক্ষণ করা জাতিসংঘের স্বাভাবিক দায়িত্ব। কিন্তু কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং সেই প্রতিবেদনের রাজনৈতিক ব্যবহার এক বিষয় নয়। একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নাম আসার পর সেটি ভবিষ্যতে কোনো রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক পক্ষ কীভাবে ব্যবহার করবে, সেটিই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাই শুধু ‘জাতিসংঘ কী বলেছে’ নয়; বরং ‘কী তথ্যের ভিত্তিতে বলেছে, প্রমাণ কতটা শক্তিশালী এবং এই বয়ান থেকে কারা কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে’—এসব প্রশ্নও করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘বাফার রাষ্ট্র’ বানানোর কোনো প্রমাণিত আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা আছে—এমন দাবিও এখনই করা যায় না। কিন্তু অঞ্চলটির ভূগোল এমন যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিকীকরণের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। একটি অঞ্চলকে আলাদা রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য সবসময় সরাসরি স্বাধীনতার দাবি দিয়ে শুরু করতে হয় না; কখনো নিরাপত্তা, মানবিক সংকট, অধিকার, শরণার্থী সমস্যা ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার ধারাবাহিকতাও একটি ভূখণ্ডকে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে। তবে এটি একটি সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক মডেল—বাংলাদেশকে ঘিরে এমন পরিকল্পনা বাস্তবে রয়েছে, এমন প্রমাণ নয়।
আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোনো একক জঙ্গি সংগঠন নয়; বরং নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যাকে আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হতে দেওয়া। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যা, মিয়ানমারের সংঘাত, রোহিঙ্গা সংকট এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত প্রতিযোগিতা একই সময়ে তীব্র হলে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল আন্ত