
প্রীতম দত্ত, বান্দরবান।
বান্দরবানে নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য, অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে এবং রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে একটি চক্র ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অবৈধ সুবিধা আদায় করছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন আবেদনকারী ও ভুক্তভোগী। এ ঘটনায় কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সার সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে বান্দরবান জেলার সাতটি উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় নতুন সার ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে ৩৪টি ডিলার পদের বিপরীতে মোট ৯৫ জন প্রার্থী আবেদন করেন।
তবে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক আবেদনকারী দাবি করেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী জামানতের পরিমাণ ১০ হাজার টাকা হলেও তাঁদের কাছ থেকে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া নিয়োগ তালিকায় প্রথম বা দ্বিতীয় অবস্থানে রাখার আশ্বাস দিয়ে কোনো কোনো প্রার্থীর কাছ থেকে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, কৃষি বিভাগ ও প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মনিটরিং কমিটির যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়া কিংবা যোগ্যতার প্রশ্ন থাকা কয়েকজন প্রার্থীকে চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদর পৌরসভার এক আবেদনকারী অভিযোগ করেন, পাঁচ লাখ টাকার চুক্তির মাধ্যমে জেলা বিএনপির এক যুগ্ম আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের এক সদস্যের প্রভাব কাজে লাগিয়ে যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়া এক প্রার্থীকে পুনরায় তালিকার দ্বিতীয় স্থানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে ওই প্রার্থীকে ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
এদিকে, পুরোনো ডিলার হাবিবুর রহমান হাবিব অভিযোগ করে বলেন, “আমি তালিকার এক নম্বরে থাকা সত্ত্বেও আমাকে বাদ দিয়ে তালিকার দুই নম্বরে থাকা আবেদনকারীকে অবৈধভাবে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য এবং জেলা কৃষকদলের সভাপতি ইয়াছিনুল হক রিপন বলেন, ঘুষ বাণিজ্য কিংবা তদবিরের সঙ্গে কৃষকদলের কোনো নেতাকর্মীর জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দীন বলেন, নির্ধারিত নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ১০ সদস্যের মনিটরিং কমিটি আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই-বাছাই করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলারদের কার্যক্রম সন্তোষজনক না হলে তাঁদের লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস এম হাসান বলেন, “কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি, যা নিয়ে জেলা মনিটরিং কমিটি কাজ করছে। তবে ঘুষ বাণিজ্য বা প্রভাব খাটিয়ে তালিকাভুক্তির বিষয়টি উপজেলা মনিটরিং কমিটি বলতে পারবে। আমাদের কাছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি।”
সার ডিলার নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়মের এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীরা। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা হলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন তাঁরা।