
*আলীকদম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওষুধ সংকট, অচল আল্ট্রাসাউন্ড*
শিশুদের প্রয়োজনীয় ওষুধ মিলছে না, বিপাকে পাহাড়ের মানুষ; স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে প্রশ্ন, জবাবদিহি দাবি জনতার
মুহাম্মদ সালাহ উদ্দীন, স্টাফ রিপোর্টার : আলীকদম (বান্দরবান)
বান্দরবানের দুর্গম উপজেলা আলীকদমের মানুষের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই সরকারি চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসা।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বহুল ব্যবহৃত ওষুধের সংকট, শিশুদের প্রয়োজনীয় সিরাপের ঘাটতি এবং আল্ট্রাসাউন্ড সেবা বন্ধ থাকায় হাসপাতালটির সেবার মান নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চিকিৎসক থাকলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষার সুবিধা না থাকায় কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে এবং রোগী, স্বজন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বহির্বিভাগে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে এলেও হাসপাতালের ফার্মেসিতে প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না।
বিশেষ করে শিশুদের চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত অ্যামক্সিসিলিন সিরাপ, ফেক্সোফেনাডিন সিরাপ, অ্যামব্রক্সল সিরাপ, ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স সিরাপ, হিস্টাসিন সিরাপসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহে নেই বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনরা।
চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়েও হাসপাতাল থেকে ওষুধ না পেয়ে অনেক পরিবার বাইরে থেকে উচ্চমূল্যে ওষুধ কিনতে বাধ্য হচ্ছে। অর্থাভাবে কেউ কেউ আবার প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে না পেরে অসম্পূর্ণ চিকিৎসা নিয়েই বাড়ি ফিরছেন।
এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র, নিম্ন আয়ের পরিবার এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষ।
শুধু ওষুধের সংকটই নয়, হাসপাতালের আল্ট্রাসাউন্ড সেবাও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
ফলে গর্ভবতী নারী, শিশু ও জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে লামা, চকরিয়া, বান্দরবান সদর কিংবা কক্সবাজারে যেতে হচ্ছে।
এতে চিকিৎসা ব্যয় যেমন বেড়ে যাচ্ছে, তেমনি জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মোহাম্মদ হাসান বলেন,
“যেসব বহুল ব্যবহৃত ওষুধ নিয়মিত রোগীদের দেওয়া উচিত, তার মধ্যে কিছু ওষুধ বর্তমানে আমাদের কাছে নেই। ওষুধের সংকট থাকায় প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী রোগীদের ওষুধ দিতে হচ্ছে।
এছাড়া বর্তমানে অর্থবছরের জুন মাসের ক্লোজিং চলমান থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িকভাবে কিছু প্রভাব পড়েছে। নতুন অর্থবছরে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছি।”
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই ব্যাখ্যা থাকলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রতি অর্থবছরের শেষ সময়ে যদি ওষুধের সরবরাহে এমন সংকট দেখা দেয়, তাহলে তার দায় কেন সাধারণ রোগীদের বহন করতে হবে? তারা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবা একটি মৌলিক অধিকার। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি হাসপাতালে ওষুধ সরবরাহ, চিকিৎসা সরঞ্জামের কার্যকারিতা এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা স্বাস্থ্য প্রশাসনের নিয়মিত দায়িত্ব।
এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি থাকলে তার কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সেবার মান ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নিয়মিত তদারকি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, আলীকদমের মতো দুর্গম পার্বত্য এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা শুধু একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত।
সময়মতো চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেলে রোগ জটিল হতে পারে, চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যেতে পারে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন দরিদ্র মানুষ।
স্থানীয়দের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে শিশুদের প্রয়োজনীয় ওষুধসহ সব বহুল ব্যবহৃত ওষুধের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে, অচল আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন সচল অথবা নতুন মেশিন স্থাপন করতে হবে এবং হাসপাতালের সার্বিক স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
পাশাপাশি ওষুধ সরবরাহ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেবা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা দেখতে চান তারা।
পাহাড়ের মানুষের প্রত্যাশা একটাই—সরকারি হাসপাতাল যেন শুধু একটি ভবন না হয়ে, সত্যিকার অর্থেই তাদের নির্ভরতার শেষ ঠিকানা হয়ে ওঠে।