
উলুধ্বনি ও ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিতে মুখর রাজশাহী, বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা
অপু দাস
রাজশাহী ব্যুরো।
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ভক্তি ও উৎসবমুখর পরিবেশে রাজশাহীতে উদযাপিত হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ উৎসব উপলক্ষে নগরজুড়ে বিরাজ করছে আনন্দঘন পরিবেশ। সকাল থেকেই বিভিন্ন মন্দিরে ভক্তদের ঢল নামে। শ্রীজগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা মহারানীর দর্শন এবং আশীর্বাদ লাভের উদ্দেশ্যে নানা বয়সী ভক্তরা মন্দিরে সমবেত হন।
সনাতন ধর্মমতে, রথে অধিষ্ঠিত শ্রীজগন্নাথদেবের দর্শন আত্মিক কল্যাণ, পুণ্য অর্জন এবং জীবনের মঙ্গল বয়ে আনে। এ বিশ্বাসকে ধারণ করেই রাজশাহী মহানগরী ছাড়াও জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের এলাকা থেকে হাজারো ভক্ত রথযাত্রায় অংশ নিতে নগরীতে আসেন।
রথযাত্রা উপলক্ষে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) রাজশাহী এবং ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী হনুমান জিউর আখড়া মন্দির কমিটি পৃথকভাবে নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান, কীর্তন, প্রার্থনা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের উদ্যোগ নেয়। বিকেলে নগরীর রেশমপট্টি এলাকার ইসকন মন্দির এবং সাহেববাজার এলাকা থেকে পৃথকভাবে বর্ণাঢ্য রথযাত্রা বের হয়।
সুসজ্জিত রথে শ্রীজগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা মহারানীকে নিয়ে শোভাযাত্রা নগর পরিক্রমা শুরু করলে চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি এবং ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিতে। হাজারো ভক্ত রথের দড়ি টেনে নিজেদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রকাশ করেন এবং পুণ্য লাভের প্রত্যাশায় শোভাযাত্রায় অংশ নেন।
শোভাযাত্রাটি নগরীর কুমারপাড়া, সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট, বাটার মোড়, রানীবাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পথের দুই পাশে অবস্থান নেওয়া অসংখ্য নারী-পুরুষ ভক্ত ফুল, ফল, ধূপ, প্রদীপসহ নানা উপকরণ নিবেদন করে ভগবানের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং আরতির মাধ্যমে প্রার্থনায় অংশগ্রহণ করেন।
সকালের শুরু থেকেই নগরীর বিভিন্ন মন্দিরে বিশেষ ধর্মীয় কর্মসূচি পালিত হয়। বিশ্বশান্তি, দেশের সমৃদ্ধি এবং মানবকল্যাণ কামনায় বিশেষ পূজা, রাজভোগ নিবেদন, ভগবদ্গীতা পাঠ, নামসংকীর্তন ও সমবেত প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মাঝে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়।
রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে রাজশাহীর সাগরপাড়া ও আশপাশের এলাকায় বসেছে ঐতিহ্যবাহী রথের মেলা। মেলায় খেলনা, মাটির তৈরি তৈজসপত্র, বাঁশ ও কাঠের বিভিন্ন সামগ্রী, মিষ্টি, মণ্ডা এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ঐতিহ্যবাহী পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে মেলা প্রাঙ্গণ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি এই মেলা স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে পরিচিত।
উৎসবটি শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করতে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি), জেলা প্রশাসন এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। রথযাত্রার পুরো রুটজুড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা নিরাপদ পরিবেশে উৎসবে অংশ নিতে পারেন।
সনাতন ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী, রথযাত্রার সাত দিন পর ‘উল্টো রথযাত্রা’র মাধ্যমে শ্রীশ্রী জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রা মহারানী নিজ মন্দিরে প্রত্যাবর্তন করবেন। এর মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে চলতি বছরের রথযাত্রা উৎসব।