
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি, আতঙ্কে সাধারণ মানুষ
মোহাম্মদ হানিফ ফেনী জেলা প্রতিনিধি
লেমুয়া ইউনিয়নে রাজনৈতিক নির্যাতনের ভয়াবহ অভিযোগ
ফেনী সদর উপজেলার ৯ নম্বর লেমুয়া ইউনিয়নে বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে স্থানীয়দের অভিযোগে। বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চালানো হয় মিথ্যা মামলা, গ্রেফতার, জেল-জুলুম, বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট—এমনটাই দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোশারফ হোসেন নাসিমের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী চক্র পুরো ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী নুরুল আমিন ও যুবলীগ নেতা শংকর শীলের সক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার ও অভিযান পরিচালনার জন্য তালিকা তৈরি করে প্রশাসনের কাছে সরবরাহ করা হতো।
বিশেষ করে যুবলীগ নেতা শংকর শীলকে কেন্দ্র করে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি জেলার প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে প্রভাব বিস্তার করতেন এবং সেই প্রভাব ব্যবহার করে ব্যক্তিগত বিরোধেও মানুষকে মিথ্যা মামলায় জড়াতেন। সামান্য বিরোধের জেরেও মারধর, হামলা কিংবা মামলার শিকার হতে হতো সাধারণ মানুষকে। ফলে পুরো ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
২০১৩-২০১৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নির্দলীয় সরকারের দাবিতে চলা অবরোধ কর্মসূচির মধ্যে লেমুয়া ইউনিয়নের ভাঙ্গার তাকিয়া এলাকায় একটি অবস্থান গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, সেখানে নিয়মিত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়া হতো। ফেনীগামী বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের আটক করে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে অনেক নিরীহ ব্যক্তি শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে দীর্ঘদিন কারাভোগ করেছেন।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সন্ধ্যার পর শুরু হতো বাড়ি বাড়ি অভিযান। পুলিশ ও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সমন্বয়ে পরিচালিত এসব অভিযানে কাউকে না পেলে ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হতো। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, এসব অভিযানে শংকর শীল, পঙ্কজ, আজাদ, দাউদ ও সমীরসহ কয়েকজনকে অস্ত্র হাতে দেখা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, শংকর শীলের কাছে একটি শটগান ও পিস্তল ছিল, যা তৎকালীন চেয়ারম্যানের অস্ত্র বলে স্থানীয়রা ধারণা করেন। গত ৫ আগস্টের পর চেয়ারম্যান এলাকা ত্যাগ করলেও এসব অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে করে এলাকাবাসীর মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটতে পারে।
এছাড়া ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফেনীতে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনাতেও শংকর শীলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেছেন, তাকে সেদিন অস্ত্রসহ দেখা গেছে।
অন্যদিকে, শংকর শীলের ভাই দীপঙ্কর শীলকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ফেনী পৌরসভায় অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকরি পাওয়ার পর চাকরি হারিয়ে পুনরায় নিজেকে বিএনপির কর্মী পরিচয় দিয়ে বহাল হন এবং প্রভাবশালী নেতার সুপারিশের কথা প্রচার করেন। তবে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা এই দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তাদের বক্তব্য, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে দীপঙ্কর শীলকে কখনো দলের কোনো কর্মসূচিতে দেখা যায়নি।
লেমুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপির সভাপতি ফেরদৌস কোরাইশি, সাবেক যুবদল নেতা নিজাম উদ্দিন, সাবেক কৃষক দল নেতা মহিউদ্দিন এবং বর্তমান কৃষক দল সভাপতি সুজল হকসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ প্রশাসনের প্রতি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা বিশেষভাবে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
এলাকাবাসীর মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে লেমুয়া ইউনিয়নে যেকোনো সময় বড় ধরনের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে