
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর
গাজীপুর জেলার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের তেলিপাড়া এলাকায় বাল্যবিবাহ এবং নিয়মবহির্ভূত নিকাহ রেজিস্ট্রি সিন্ডিকেটের শিকড় কতদূর বিস্তৃত, তা অনুসন্ধানে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। একদিকে আইনের তোয়াক্কা না করে একাধিক কাজী অফিস পরিচালনা, অন্যদিকে তথ্য সংগ্রহে যাওয়া সাংবাদিকদের সরাসরি অপহরণ ও প্রাণনাশের হুমকি—সব মিলিয়ে গাজীপুরে স্বাধীন সাংবাদিকতা এখন চরম ঝুঁকির মুখে। এই অনুসন্ধানের সময় সরেজমিনে উপস্থিত থেকে দেখা গেছে, অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া হলে গণমাধ্যমকর্মীদের জনসম্মুখে তুলে নিয়ে যাওয়ার স্পর্ধা দেখায়।
ঘটনার সূত্রপাত ও কল রেকর্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য
তেলিপাড়া এলাকায় স্থানীয় কাজী এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বাল্যবিবাহ এবং অনিয়মিত বিয়ে রেজিস্ট্রির অভিযোগ ছিল। তথ্য যাচাইয়ের জন্য একদল সংবাদকর্মী গত সপ্তাহে তার কার্যালয়ে যান। কাজী এরশাদ উপস্থিত না থাকায় সেখানে দায়িত্বপালনরত দেলোয়ার হোসেনের মাধ্যমে তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হয়।
এ সময় বাল্যবিবাহ ও একাধিক অফিস পরিচালনার বিষয়ে প্রশ্ন করতেই কাজী এরশাদ উত্তেজিত হয়ে পড়েন। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে তিনি জাতীয় সাপ্তাহিক ‘ক্রাইম পেট্রোল’-এর প্রতিবেদক হাসানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে এবং দেখে নেওয়া হবে। এই হুমকির স্পষ্ট অডিও রেকর্ড বর্তমানে সাংবাদিকদের হাতে রয়েছে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী সাংবাদিক বাসন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং ১২৪) করেছেন।
বাল্যবিবাহ ও সুমাইয়ার আত্মাহুতি: এক করুণ বাস্তবতা
এই সিন্ডিকেটের কার্যক্রম কেবল নিয়ম লঙ্ঘনেই সীমাবদ্ধ নেই, এর ফলে ঝরছে তাজা প্রাণ। সম্প্রতি সুমাইয়া আক্তার সান্তনা নামে এক কিশোরীর আত্মহত্যার ঘটনা পুরো এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে। স্থানীয়দের জোরালো দাবি, অপরিনত বয়সে বিয়ে এবং পরবর্তী পারিবারিক অশান্তিই তাকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সুমাইয়ার এই বাল্যবিবাহটি কাজী এরশাদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছিল।
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী, ২১ বছর পূর্ণ করেননি এমন কোনো পুরুষ এবং ১৮ বছর পূর্ণ করেননি এমন কোনো নারী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে তা বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হয়। এই আইনের ধারা ৮ অনুযায়ী, বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করলে সংশ্লিষ্ট কাজী বা ব্যক্তির অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড বা ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। কিন্তু গাজীপুরের এই সিন্ডিকেট আইনের কোনো তোয়াক্কাই করছে না।
আইনের লঙ্ঘন ও কাজী অফিসের নামে অরাজকতা
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একই ব্যক্তি প্রভাব খাটিয়ে একটি ওয়ার্ডে একাধিক কাজী অফিস পরিচালনা করছেন। মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ এবং এর বিধিমালা অনুযায়ী, একজন কাজী নির্দিষ্ট এলাকা বা ওয়ার্ডের বাইরে অফিস পরিচালনা করতে পারেন না। কিন্তু এরশাদ ও তার সহযোগীরা ক্ষমতার দাপটে একাধিক পয়েন্টে অফিস খুলে বসেছেন, যা বাল্যবিবাহ ও ভুয়া রেজিস্ট্রির পথ প্রশস্ত করছে।
সাংবাদিক নির্যাতনে গাজীপুরের কালিমালিপ্ত রেকর্ড
গাজীপুরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হুমকির ঘটনা এটিই প্রথম নয়। গত এক বছরে এখানে সাংবাদিক নির্যাতনের যে চিত্র দেখা গেছে, তা যেকোনো সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনক।
১. আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যাকাণ্ড (৭ আগস্ট, ২০২৫): চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ হারান সাংবাদিক তুহিন। প্রকাশ্যে কুপিয়ে তাকে হত্যা করা হয়, যা দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৩০২ অনুযায়ী একটি চরম অপরাধ।
২. আনোয়ার হোসেন সৌরভের ওপর হামলা: তুহিন হত্যার মাত্র একদিন আগে পুলিশের সামনেই সৌরভকে ইট দিয়ে পিটিয়ে জখম করা হয়। এটি দণ্ডবিধির ধারা ৩২৪ ও ৩২৫-এর সরাসরি লঙ্ঘন।
৩. বনদস্যু ও ভূমিদস্যুদের তাণ্ডব: কাপাসিয়ায় বন উজাড়ের খবর সংগ্রহে গিয়ে ৩ জন এবং সদর এলাকায় ৪ জন সাংবাদিক গত বছরের বিভিন্ন সময়ে হামলার শিকার হয়েছেন। তাদের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়া (ধারা ৩৯২) এবং শারীরিক লাঞ্ছনা (ধারা ৩২৩) করা হয়েছে।
৪. আরিফ খান আবিরের অপহরণ আতঙ্ক: সরকারি জমি দখলের খবর প্রকাশের জেরে আবিরকে অপহরণ করে আটকে রাখা হয়েছিল। এটি দণ্ডবিধির ধারা ৩৬৫ (অপহরণ) এর আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
আইনি বিশ্লেষণ: হুমকি ও নির্যাতনের সাজা
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে বাধা প্রদান এবং হুমকি দেওয়া গুরুতর অপরাধ। কাজী এরশাদের এই হুমকির ক্ষেত্রে সরাসরি নিচের আইনি ধারাগুলো প্রযোজ্য:
দণ্ডবিধি ধারা ৫০৬: যদি কেউ অন্যকে প্রাণনাশের বা বড় কোনো ক্ষতির হুমকি দেয়, তবে তাকে অপরাধমূলক ভীতিপ্রদর্শন বলা হয়। এর সাজা হিসেবে ২ বছর থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান আছে।
সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ (ধারা ২৫): যদি ডিজিটাল মাধ্যমে (যেমন কল রেকর্ড বা সোশ্যাল মিডিয়া) কাউকে ভয়ভীতি দেখানো হয়, তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
দণ্ডবিধি ধারা ১৮৯: কোনো সরকারি কাজ বা জনস্বার্থের কাজে বাধা দেওয়ার জন্য হুমকি দিলে তার জন্য আলাদা সাজার ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রশাসনিক স্থবিরতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
গাজীপুরে সাংবাদিকরা কেন বারবার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন? স্থানীয় সাংবাদিকদের মতে, এর প্রধান কারণ বিচারহীনতা। তুহিন হত্যাকাণ্ড বা সৌরভের ওপর হামলার ঘটনায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় কাজী এরশাদদের মতো ব্যক্তিরা সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হওয়ার সাহস পাচ্ছে।
বাসন থানায় জিডি করার পর বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হলেও কাজী এরশাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং এই সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয়ভাবে তাদের অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
গাজীপুরের তেলিপাড়ার এই ঘটনাটি কেবল একজন সাংবাদিককে হুমকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একদিকে একটি কিশোরীর প্রাণহানির জন্য দায়ী সিন্ডিকেটের আস্ফালন, অন্যদিকে সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধের অপচেষ্টা। প্রশাসনের উচিত হবে অবিলম্বে কল রেকর্ডের সত্যতা যাচাই করে অভিযুক্ত কাজী ও তার সহযোগীদের আইনের আওতায় আনা।
বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করতে হলে এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দণ্ডবিধির ৫০৬ ধারা এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের ৮ ধারা কার্যকর প্রয়োগ করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, গাজীপুরের মাটি সাংবাদিকদের জন্য বধ্যভূমিতে পরিণত হবে এবং অপরাধী চক্র সমাজকে গ্রাস করবে।
প্রশাসনের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহ্বান—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করুন এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে এই ভয়ংকর সিন্ডিকেট ভেঙে দিন।
প্রয়োজনীয় আইনি তথ্যসূত্র:
দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (ধারা ৩০২, ৩২৩, ৩৫৩, ৫০৬)
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭
সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩
মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪