
ফেনীতে অধিকার’র সমাবেশ: গুম প্রতিরোধসহ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল নয়, অবিলম্বে আইনে পরিণতের দাবি
মোহাম্মদ হানিফ ফেনী জেলা প্রতিনিধি।
জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির সুপারিশে ক্ষোভ; মানববন্ধনে ভুক্তভোগী পরিবারের কান্না—“বিচার না পেলে কোথায় যাবো?”
ফেনীতে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর উদ্যোগে গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশসহ অন্তবর্তীকালীন সরকারের জারি করা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো বাতিলের প্রক্রিয়া বন্ধ করে দ্রুত আইনে পরিণত করার দাবিতে সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে ফেনী প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, মানবাধিকার কর্মী ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন।
ভুক্তভোগী মায়ের আকুতি
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গুমের শিকার মাহবুবুর রহমান রিপনের মা রওশন আরা বেগম আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,
“১১ বছর আগে আমার ছেলেকে র্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো বিচার পাইনি। এখনো আশা করছি, কিন্তু অধ্যাদেশ কার্যকর না হলে সেই আশাও হারিয়ে যাবে।”
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “যদি বর্তমান সরকারও বিচার না করে, তাহলে আমি কার কাছে বিচার চাইবো?”
বক্তাদের বক্তব্য
প্রবীণ সাংবাদিক এ কে এম আবদুর রহিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানবাধিকার সংগঠক মো. আবুল হাসান শাহীন।
সঞ্চালনা করেন অধিকার ফেনীর ফোকাল পার্সন সাংবাদিক নাজমুল হক শামীম।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন—
সম্পাদক মামুনুর রশিদ
সম্পাদক এন এন জীবন
শিক্ষক নেতা মোহাম্মদ মহিউদ্দিন খোন্দকার
সাংস্কৃতিক সংগঠক কাজি ইকবাল আহমেদ পরান
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন শাহজালাল ভূইয়া, রোকেয়া ইসলাম, মাহফুজুর রহমান শিপু প্রমুখ।
অধ্যাদেশ বাতিলে তীব্র প্রতিবাদ
লিখিত বক্তব্যে অধিকার জানায়, জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ
দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত অধ্যাদেশ
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫
অধিকার অভিযোগ করে, এসব অধ্যাদেশ বাতিল হলে ১০ এপ্রিলের পর এগুলোর কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাবে, যা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা সৃষ্টি করবে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সমালোচনা
বক্তারা বলেন, অতীত সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করে বিরোধী দল ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে।
তারা আরও দাবি করেন, সেই প্রেক্ষাপটে অন্তবর্তীকালীন সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক অধ্যাদেশ জারি করেছিল, যা এখন বাতিলের মাধ্যমে পুনরায় পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জনগণের রায়ের প্রতি অবজ্ঞা?
অধিকার তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করে, সাম্প্রতিক গণভোটে ৬৮ শতাংশ ভোটার সংস্কারমূলক উদ্যোগের পক্ষে মত দিয়েছেন। কিন্তু সেই জনমত উপেক্ষা করে অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে বলে সংগঠনটি অভিযোগ করে।
মানববন্ধন
সমাবেশ শেষে ফেনী প্রেসক্লাব-এর সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার, মানবাধিকার কর্মী এবং স্থানীয় নাগরিকরা অংশ নেন।
দাবি
সমাবেশ থেকে অধিকার সরকারের প্রতি জোর দাবি জানায়—
গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলের প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে
দ্রুত জাতীয় সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করে আইন হিসেবে পাস করতে হবে
গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করতে হবে
উপসংহার
মানবাধিকার কর্মীরা বলেন, “মানবাধিকার ও সুশাসন ছাড়া কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না।” তাই তারা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী এসব অধ্যাদেশ দ্রুত আইনে পরিণত করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে।