
বিশেষ প্রতিবেদন: যোগ্য নেতৃত্বের সংকট ও জনপ্রতিনিধিদের মানদণ্ড নির্ধারণের আবশ্যকতা
জামালপুর জেলা প্রতিনিধি মোঃ আজাদ হোসেন নিপুঃ-
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করে তার নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতাদের ওপর। সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে জনমনে নানা আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হলেও, সচেতন মহলের দাবি—তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি জরুরি হলো সংসদ সদস্য (MP), ইউপি চেয়ারম্যান এবং মেম্বারদের শিক্ষাগত ও চারিত্রিক মানদণ্ড নিশ্চিত করা।
১. ভুল সংশোধনের সুযোগ বনাম অপূরণীয় ক্ষতি
একজন সাংবাদিকের লেখনীতে কোনো ভুল থাকলে বা তথ্যে ঘাটতি থাকলে তা সম্পাদকের ডেস্কে সংশোধনের সুযোগ থাকে। এমনকি প্রকাশের পর ভুল প্রমাণিত হলে ‘ভুল স্বীকার’ করার আইনি ও নৈতিক কাঠামো সংবাদপত্রে বিদ্যমান।
কিন্তু রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী আসনে কিংবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির চেয়ারে যদি কোনো অশিক্ষিত, অযোগ্য বা দুশ্চরিত্রের ব্যক্তি বসে যান, তবে তার মাশুল দিতে হয় পুরো জাতিকে। তাদের একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা একটি স্বার্থান্বেষী পদক্ষেপ পুরো এলাকার উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে এবং বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই ক্ষতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপূরণীয়।
২. জনপ্রতিনিধিদের জন্য নূন্যতম যোগ্যতার প্রয়োজনীয়তা
বর্তমানে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই। অথচ রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীকেও নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করতে হয়।
আইন প্রণয়নে সক্ষমতা: সংসদ সদস্যদের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন করা। আইন বা সংবিধান সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান না থাকলে দক্ষ আইন প্রণেতা হওয়া অসম্ভব।
বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা: ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের বিশাল অংকের বাজেট ব্যবস্থাপনা করতে হয়। ন্যূনতম শিক্ষা না থাকলে তারা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বুঝতে ব্যর্থ হন এবং দুর্নীতির আশ্রয় নেন।
৩. চারিত্রিক মানদণ্ড ও সামাজিক প্রভাব
শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘চারিত্রিক মানদণ্ড’। দখলবাজি, মাদকাসক্তি বা দুর্নীতির অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে আছে, তারা জনসেবার চেয়ে জনভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
“অযোগ্য নেতৃত্ব একটি রাষ্ট্রকে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। যখন একজন দখলবাজ বা মাদকাসক্ত ব্যক্তি ক্ষমতার মসনদে বসে, তখন সমাজ থেকে নৈতিকতা বিদায় নেয়।”
৪. সাংবাদিকদের ভূমিকা ও যোগ্যতা
জনপ্রতিনিধিদের যোগ্যতার পাশাপাশি সাংবাদিকদের যোগ্যতার বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সাংবাদিকরা সমাজের দর্পণ। তাই এই পেশায় আসতে হলেও:
ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি: তথ্যের গভীরতা এবং প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন।
পেশাদার প্রশিক্ষণ: সাংবাদিকতার নীতিমালা ও নৈতিকতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হবে।
দায়বদ্ধতা: অযোগ্য সাংবাদিকরা যেমন ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারেন, তেমনি শিক্ষিত সমাজ গঠনেও তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
সুপারিশঃ
রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে সাংবাদিকদের যোগ্যতার চেয়েও জনপ্রতিনিধিদের শিক্ষাগত ও চারিত্রিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি। নির্বাচনী আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে নিচের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন:
1. শিক্ষাগত যোগ্যতা:সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের জন্য অন্তত স্নাতক বা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা।
2. ক্লিন ইমেজ: প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে চারিত্রিক সনদ এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত না থাকার নিশ্চয়তা রাখা।
3. মাদক পরীক্ষা: জনপ্রতিনিধিদের জন্য ডোপ টেস্ট বা মাদক পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা।
পরিশেষে, রাষ্ট্র যদি যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব পায়, তবে প্রতিটি বিভাগ—সেটি সাংবাদিকতা হোক বা প্রশাসন—স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি কাঠামোর মধ্যে চলে আসবে। যোগ্য নেতৃত্বই পারে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে।