
অনলাইন ডেস্ক
ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) বাংলাদেশি দক্ষ চালকদের জন্য উন্মোচিত হলো এক বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ। চলতি ২০২৬ সালে বাংলাদেশ থেকে নতুন করে আরও ৬ হাজার দক্ষ ড্রাইভার নিয়োগ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ‘দুবাই ট্যাক্সি কোম্পানি’। এই বৃহৎ নিয়োগ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আগামীকাল সোমবার থেকে রাজধানীর ‘বাংলাদেশ-কোরিয়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ (বিকেটিটিসি)-এ সরাসরি চালক নির্বাচন ও নিয়োগের ইন্টারভিউ বা সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে।
আজ রোববার (১৭ মে, ২০২৬) রাজধানীতে অবস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে দুবাই ট্যাক্সি কোম্পানির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকেই এই আশাব্যঞ্জক এবং ইতিবাচক তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।
রোববার সকালে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে দুবাই ট্যাক্সি কোম্পানির প্রতিনিধি দলকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। বৈঠক শেষে তিনি বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক দক্ষ ড্রাইভার নিয়োগের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান এবং দুবাই ট্যাক্সি কোম্পানিকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
মন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, “বাংলাদেশি কর্মীরা অত্যন্ত পরিশ্রমী ও বিশ্বস্ত। দুবাই ট্যাক্সি কোম্পানির এই উদ্যোগের ফলে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও মজবুত হবে। আমরা আশা করি ভবিষ্যতেও এই নিয়োগ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।” একই সাথে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া যাতে স্বচ্ছ, দ্রুত এবং নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়, সেজন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রশাসনিক ও কারিগরি সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
বৈঠকে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী দুবাই ট্যাক্সি কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছে একটি বিশেষ মানবিক আহ্বান জানান। তিনি অনুরোধ করেন, নির্বাচিত কর্মীরা দুবাই যাওয়ার পর সেখানে যে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সেই প্রশিক্ষণকালীন সময়েও যেন তাদের নিয়মিত বেতন-ভাতা বা পকেট মানি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে নতুন কর্মীরা শুরুতেই কোনো আর্থিক সংকটে পড়বেন না। এছাড়াও, ড্রাইভারের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে দক্ষ ডাক্তার, নার্স, প্রকৌশলীসহ অন্যান্য পেশাজীবী কর্মী নিয়োগের জন্য ইউএই সরকারকে অনুরোধ জানাতে প্রতিনিধি দলটির প্রতি আহ্বান জানান মন্ত্রী।
সৌজন্য সাক্ষাৎকালে দুবাই ট্যাক্সি কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা বাংলাদেশি চালকদের কর্মদক্ষতা, সততা এবং কঠোর পরিশ্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তারা জানান, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২৭টি দেশের ১৫ হাজারেরও বেশি কর্মী তাদের প্রতিষ্ঠানে ট্যাক্সি ও বিলাসবহুল লিমুজিন চালক হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে কর্মরত রয়েছেন। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হলো, এই বিশাল কর্মীবাহিনীর মধ্যে প্রায় ৮ হাজারই হচ্ছেন বাংলাদেশি নাগরিক।
প্রতিনিধি দলের সদস্যরা স্পষ্ট করেন যে, বাংলাদেশি চালকদের বিশেষ কর্মদক্ষতা এবং ট্রাফিক নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার কারণেই তাদের নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তারা আরও জানান, আগামীকাল থেকে ঢাকার বাংলাদেশ-কোরিয়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যে ইন্টারভিউ শুরু হচ্ছে, তার মাধ্যমে প্রাথমিক ধাপে প্রথম লটে দেড় হাজার (১,৫০০) চালককে চূড়ান্তভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে। আর পর্যায়ক্রমে এই বছরের মধ্যেই মোট ৬ হাজার বাংলাদেশি চালককে দুবাইতে নিয়ে যাওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বিদেশি সংস্থাকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি দেশের সাধারণ কর্মীদের স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ থেকে একজন সাধারণ চালকের দুবাই যেতে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। আমাদের দেশের অধিকাংশ কর্মীই অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার থেকে আসেন। জমিজমা বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তাদের বিদেশে পাড়ি জমাতে হয়।”
কর্মীদের এই আর্থিক কষ্টের কথা বিবেচনা করে প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক রিক্রুটিং এজেন্সি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশ দিয়ে বলেন, কোনোভাবেই যেন অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় বা দালালের দৌরাত্ম্য না থাকে। সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে একজন চালকের সামগ্রিক অভিবাসন ব্যয় যেন সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মী পাঠানোর জন্য অনুমোদিত দেশীয় রিক্রুটিং এজেন্সি ‘আল আনাস ওভারসিজ’-এর প্রতিনিধিরাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তারা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান, বর্তমানে দুবাই ট্যাক্সি কোম্পানিতে শুধু ড্রাইভারই নয়, এর পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক দক্ষ ক্লিনার, অটো-টেকনিশিয়ান, এসি মেকানিক এবং কার মেকানিক নিয়োগের বিষয়েও দুবাইয়ের প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও আগ্রহী। ফলে আগামী দিনগুলোতে ড্রাইভিং ছাড়াও অন্যান্য কারিগরি খাতে বাংলাদেশের যুবসমাজের জন্য দুবাইতে বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে যাচ্ছে। উচ্চপর্যায়ের এই দ্বিপাক্ষিক ও সৌজন্য সাক্ষাৎকালে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ, দুবাই ট্যাক্সি কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিএআরএ (BARA)-এর নেতৃবৃন্দ এবং মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।