
হোসেন ফয়সাল, লোহাগাড়া প্রতিনিধি
লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার শান্ত ও ঐতিহ্যবাহী জনপদকে হিংসা, বিদ্বেষ, ব্যক্তিস্বার্থ এবং সামাজিক অবক্ষয় থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে এক আবেগঘন ও দূরদর্শী বার্তা দিয়েছেন তরুণ সমাজকর্মী আরমান হোসেন ফয়সাল। বুধবার (২০ মে, ২০২৬) এক বিশেষ বিবৃতিতে তিনি লোহাগাড়ার সর্বস্তরের এলাকাবাসীর প্রতি সালাম ও শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি সুন্দর, নিরাপদ এবং বাসযোগ্য সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পারিবারিক শিক্ষা, যুবসমাজের নৈতিক অধঃপতন, ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতি এবং সামাজিক সম্প্রীতির নানাদিক ফুটে উঠেছে তাঁর এই খোলা চিঠিতে। যা ইতিমধ্যে লোহাগাড়ার সচেতন মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিবৃতিতে আরমান হোসেন ফয়সাল অত্যন্ত বিনয়ের সাথে নিজেকে লোহাগাড়াবাসীর সন্তান ও ভাই হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমি আপনাদের মাঝে অত্যন্ত সাধারণ একজন। আপনাদের কারো সন্তানের মতো, কারো ছোট ভাই, আবার কারো পরম বন্ধু। আমার বাবা আমাকে ছোটবেলা থেকেই একটা মহৎ কথা শিখিয়েছিলেন। তিনি বলতেন— ‘জীবনে কারো উপকার করতে না পারলেও, কখনো কারো ক্ষতি করবে না। পারলে সমাজ ও দেশের জন্য ভালো কিছু করবে।’ আমি আমার বাবার সেই আদর্শ এবং নীতিতেই আজীবন বিশ্বাসী। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমান সমাজে মানুষে মানুষের মধ্যে মানবিকতার চেয়ে প্রতিযোগিতা আর লোকদেখানো প্রদর্শনীর প্রভাব বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কে কার থেকে এগিয়ে যাবে— এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার দৌড়ে সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সততা, ভালোবাসা আর সহানুভূতির মতো চিরন্তন মানবিক গুণাবলি। মানুষ এখন অন্যের ব্যর্থতায় আনন্দ খুঁজে নেয়। পারস্পরিক সম্পর্কের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে ব্যক্তিস্বার্থ, আর নৈতিকতার জায়গা দখল করেছে চরম ভণ্ডামি। সব মিলিয়ে এই অসুস্থ পরিবেশ যেন দিন দিন সমাজকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে।
লোহাগাড়ার বর্তমান পরিস্থিতির দিকে আলোকপাত করে এই তরুণ প্রতিনিধি বলেন, “যুব সমাজের চলমান অধঃপতন আজ সচেতন মানুষদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। আমার এই ছোট্ট জীবনে আমি খুব অবাক দৃষ্টিতে লক্ষ করছি যে, নানা কারণে আমাদের এই শান্তিপ্রিয় জনপদে সহজ-সরল মানুষের মাঝে কিছু অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা সমাজে এই ধরণের নেতিবাচক ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর দেখতে চাই না। কারণ, এসব কলহ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে সমাজে সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সাংঘাতিকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে এবং তাদের ওপর মানসিক প্রভাব ফেলবে। তিনি সমাজের স্বার্থান্বেষী মহলের প্রতি কিছু তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন:
কেন আমরা ব্যক্তিস্বার্থে সমাজকে ব্যবহার করব?
সমাজের নিরীহ ও সরল মানুষদের পুঁজি করে কেন কেউ কেউ স্বার্থ হাসিল করবে?
প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কেন বারবার আমরা নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়াব?
শান্তিপ্রিয় লোহাগাড়ার সমাজকে কেন অস্থিতিশীল করে তুলব?
এই সংঘাত আর বিশৃঙ্খলা থেকে আমাদের আসলে কি লাভ হচ্ছে?
ফয়সাল নিজেই এর উত্তর দিয়ে বলেন, “না, এখানে কোনো লাভ নেই— ক্ষতি ছাড়া আমাদের আর কিছুই হচ্ছে না। তাই আসুন, আমাদের চিন্তাধারার মনোনিবেশ হোক সমাজের মান উন্নয়নে। আমরা যেন সমাজের মানুষের জন্য আতঙ্ক না হয়ে, প্রতিটি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক বা মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারি। রাজনীতির মূল লক্ষ্য যে জনকল্যাণ, তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আরমান হোসেন ফয়সাল বলেন, “আমাদের রাজনীতি হওয়া উচিত কেবলই সমাজের কল্যাণের জন্য, ব্যক্তিস্বার্থের জন্য নয়। আমরা তো সবাই একই সমাজের বাসিন্দা। আমরা একই মসজিদে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়ি, একই বাজারে বা দোকানে পাশাপাশি বসে চা খাই এবং প্রতিদিন একই রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করি। তবে কেন আমাদের মাঝে এত বিরোধ, এত দেয়াল? কেন আমরা একে অপরকে শত্রু ভাবছি? তিনি অতীতের সব গ্লানি ভুলে নতুন শুরুর আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আসুন, আমরা আমাদের অতীতের সব ভুল-ত্রুটি মুছে দিই। সকল মান-অভিমান আর রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধ ভুলে গিয়ে একটি সুন্দর, সবার জন্য নিরাপদ এবং আদর্শ বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তুলি। যেখানে আপনি, আমি— আমরা সবাই যার যার অবস্থান থেকে সচেষ্ট হয়ে পুরো সমাজকে আলোর পথে এগিয়ে নিয়ে যাব। সমাজ পরিবর্তনের এই কঠিন কাজ আমি একা করতে পারব না, আপনিও একা পারবেন না। কিন্তু আমরা লোহাগাড়াবাসী সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করলে অনেক বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। বিবৃতির শেষাংশে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুস্থ সংস্কৃতিতে আলোকিত হোক আমাদের ভালোবাসার লোহাগাড়া। কোনো অপশক্তি যেন আমাদের যুবসমাজ ও সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে না পারে। “আমরা পারব, আমরাই গড়ব”— এই স্লোগানকে বুকে ধারণ করে লোহাগাড়াকে একটি আদর্শ মডেল মডেল উপজেলা হিসেবে রূপান্তরের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন আরমান হোসেন ফয়সাল। তাঁর এই সময়োপযোগী ও মানবিক বার্তাকে লোহাগাড়ার সুধীসমাজ, শিক্ষক, ও তরুণ প্রজন্ম সাধুবাদ জানিয়েছে।