
আন্তর্জাতিক ডেস্ক,
চারিদিকে যুদ্ধ, রক্তপাত আর স্বজন হারানোর বুকফাটা আর্তনাদ। এর মাঝেই মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা সমাগত। কিন্তু ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরে নেই কোনো উৎসবের আমেজ, নেই কোনো আনন্দ-উচ্ছ্বাস। তবুও সমস্ত বাধা-বিপত্তি, কঠোর সামরিক নজরদারি এবং চরম উত্তেজনার আবহের মধ্যেই ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান—দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের ঐতিহাসিক আল-আকসা মসজিদে সমবেত হয়েছিলেন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি মুসলিম। আজ বুধবার (২৭ মে) পবিত্র ঈদুল আজহার প্রথম দিনে সেখানে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। তুর্কি আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঈদুল আজহার চার দিনের ছুটির প্রথম দিন আজ বুধবার সকাল থেকেই দখলকৃত জেরুজালেমের ওল্ড সিটির আল-আকসা মসজিদের চারপাশের চত্বর মুসল্লিদের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইসরাইলি বাহিনীর নানা বিধিনিষেধ এবং তল্লাশি চৌকি পার হয়ে হাজারো নারী, পুরুষ ও শিশু ঈদের নামাজ আদায় করতে মসজিদের প্রাঙ্গণে জড়ো হন। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফিলিস্তিনি মুসলমানরা আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হন এবং চলমান সংকট ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির জন্য বিশেষ মোনাজাত করেন।
ঈদুল আজহা মূলত মহান আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর নিজের প্রিয় সন্তানকে কুরবানি করার মহান প্রস্তুতির স্মরণে এবং আল্লাহর প্রতি অগাধ আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পালিত হয়। খ্রিস্টান ও ইহুদি সম্প্রদায়ের কাছেও তিনি হযরত আব্রাহাম নামে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় একজন ব্যক্তিত্ব। এই বিশেষ দিনে সামর্থ্যবান মুসলমানরা পশু কুরবানি করেন এবং সেই মাংসের একটি বড় অংশ সমাজের দরিদ্র, অসহায় ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে বিতরণ করে আনন্দের ভাগ নেন। কিন্তু গাজা ও জেরুজালেমের বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। মুসলিম ক্যালেন্ডারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই উৎসবটি এমন এক সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন গত বছরের অক্টোবর থেকে কাগজে-কলমে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি চুক্তি বারবার বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লঙ্ঘন করছে ইসরাইলি বাহিনী। ফিলিস্তিনিদের কাছে এবারের ঈদ কোনো আনন্দের বার্তা নিয়ে আসেনি, এসেছে স্বজনদের কবর জিয়ারত আর ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনার দিন হিসেবে। কুরবানির পশুর অভাব এবং চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অধিকাংশ ফিলিস্তিনি এবার কুরবানি দিতে পারেননি। তাদের একমাত্র কুরবানি যেন নিজের জীবন ও স্বাধীনতা।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১০ অক্টোবর ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘোষণার পর থেকেই পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার কথা ছিল। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি আগ্রাসন সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর থেকেও ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর দফায় দফায় চালানো হামলায় নতুন করে ৮৮০ জনেরও বেশি নিরীহ ফিলিস্তিনি মানুষ নিহত হয়েছেন। এছাড়াও এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ২ হাজার ৬৪৫ জনের বেশি মানুষ। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘমেয়াদি ও নৃশংস যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আকাশচুম্বী। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি মানুষ শাহাদাত বরণ করেছেন। সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো, এই বিপুল সংখ্যক নিহতদের মধ্যে সিংহভাগই নিরপরাধ নারী এবং নিষ্পাপ শিশু। বিশ্ব বিবেককে স্তব্ধ করে দিয়ে প্রতিদিন সেখানে লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের অবিরাম বিমান হামলা, আর্টিলারি সেল এবং স্থল অভিযানের ফলে গাজা উপত্যকা এখন একটি জীবন্ত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো—যার মধ্যে রয়েছে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, আবাসিক ভবন এবং পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র—সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বারবার সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছে, গাজায় এখন তীব্র খাদ্য ও পানির সংকট চলছে। দুর্ভিক্ষ কড়া নাড়ছে ফিলিস্তিনিদের দরজায়। চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে হাজারো আহত মানুষ। এমন এক মানবিক বিপর্যয়ের মহাসড়কে দাঁড়িয়েও আল-আকসার মিম্বর থেকে আজ ধ্বনিত হয়েছে তকবিরের আওয়াজ—’আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’।
নামাজ শেষে উপস্থিত মুসল্লিরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করেন এবং ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তবে তাদের চোখে ছিল অশ্রু আর মুখে ছিল স্বজন হারানোর বেদনা। ঈদের খুতবায় খতিব ফিলিস্তিনি জনগণের ঐক্য, ধৈর্য এবং আল-আকসা মসজিদের পবিত্রতা রক্ষায় দৃঢ় থাকার আহ্বান জানান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিম নেতারা আল-আকসায় ফিলিস্তিনিদের এই দৃঢ়তার প্রশংসা করেছেন। তারা বলছেন, ইসরাইলি বন্দুকের নলের মুখেও আল-আকসা প্রাঙ্গণে হাজার হাজার মানুষের এই সমাগম প্রমাণ করে যে, ফিলিস্তিনিদের হৃদয় থেকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং ধর্মীয় চেতনাকে কোনো শক্তিই মুছে ফেলতে পারবে না। পবিত্র এই দিনে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ গাজা ও ফিলিস্তিনের নির্যাতিত ভাই-বোনদের পাশে দাঁড়াবে এবং এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।