
হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় এক চরম নৃশংস ও লোমহর্ষক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। বিয়ের সম্পর্ক ছিন্ন করার জেরে রুবিনা আক্তার (২৫) নামের এক তৈরি পোশাক বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের নারী শ্রমিকের মুখমণ্ডল এসিড মেরে সম্পূর্ণ ঝলসে দিয়েছে তার সাবেক স্বামী। বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে উপজেলার বহুলা এলাকায় বাড়ির অদূরে এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে। এসিড সন্ত্রাসের শিকার রুবিনাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে প্রেরণ করা হয়েছে। এই ঘটনার পর থেকে পুরো হবিগঞ্জ জুড়ে তীব্র ক্ষোভ, চাঞ্চল্য এবং নিন্দার ঝড় বইছে। ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত থানা পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল এবং হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, হবিগঞ্জ সদর উপজেলার আনন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা মৃত আলতাব মিয়ার ছেলে উশৃঙ্খল যুবক উজ্জ্বল মিয়ার (২৮) সঙ্গে প্রায় দুই বছর আগে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল রুবিনা আক্তারের। বিয়ের পর কিছুদিন তাদের সংসার জীবন ভালো কাটলেও পরবর্তী সময়ে উজ্জ্বলের মাদকাসক্তি, যৌতুকের দাবি এবং নানাবিধ পারিবারিক বিষয়ে তাদের মাঝে তীব্র মনোমালিন্য ও কলহের সৃষ্টি হয়। উজ্জ্বল প্রায়শই রুবিনার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাত বলে নিহতের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন। সংসার টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে এবং উজ্জ্বলের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অবশেষে গত ৬ মাস আগে আইনগত উপায়ে উজ্জ্বল মিয়াকে তালাক (বিবাহ বিচ্ছেদ) প্রদান করেন রুবিনা আক্তার। তাদের দুই বছরের সংসার জীবনে দুটি সন্তান জন্ম নেয়, যারা বর্তমানে পিতা উজ্জ্বল মিয়ার হেফাজতেই রয়েছে।
তালাক পাওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি অহংকারী ও প্রতিহিংসাপরায়ণ উজ্জ্বল। বিয়ের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই সে রুবিনার ওপর চরম ক্ষিপ্ত ছিল এবং তাকে প্রতিনিয়ত নানাভাবে হুমকি দিয়ে আসছিল। জীবিকার তাগিদে রুবিনা আক্তার স্থানীয় একটি কোম্পানিতে শ্রমিকের চাকরি নেন। কিন্তু চাকরি নেওয়ার পরও উজ্জ্বলের হাত থেকে রেহাই পাননি তিনি। রুবিনা যখন প্রতিদিন সকালে কর্মস্থলে যেতেন এবং কাজ শেষে রাতে বাড়ি ফিরতেন, তখন রাস্তাঘাটে আসা-যাওয়ার পথে প্রায়ই উজ্জ্বল তার পথরোধ করত। শুধু তাই নয়, রুবিনার কর্মস্থলের গেটে গিয়েও সে তাকে কুপ্রস্তাব দিত এবং নানাভাবে উত্যক্ত ও হেনস্তা করত। উজ্জ্বলের এসব কর্মকাণ্ডে রুবিনা ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন।
প্রতিদিনের মতো গত বৃহস্পতিবার রাতেও রুবিনা আক্তার তার কোম্পানির কাজ শেষ করে সহকর্মীদের সাথে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। রাত আনুমানিক ৯টার দিকে তিনি বহুলা এলাকায় তার নিজের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছান। গ্রাম্য ও অন্ধকার রাস্তার মোড়ে পূর্ব থেকে মারাত্মক এসিডের বোতল হাতে ওত পেতে লুকিয়ে ছিল ও হিংস্র উজ্জ্বল মিয়া। রুবিনা একা হওয়া মাত্রই উজ্জ্বল তার ওপর অতর্কিতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় রুবিনার মুখমণ্ডল লক্ষ্য করে তীব্র ক্ষতিকারক এসিড নিক্ষেপ করে। এসিডের তীব্র দাহ্যতায় রুবিনার মুখ, চোখ ও গলার চামড়া মুহূর্তের মধ্যে ঝলসে যায়। এ সময় যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে রুবিনা বিকট চিৎকার শুরু করলে আশেপাশের বাড়ির লোকজন এবং পথচারীরা লাঠিসোটা নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে আসেন। স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসতে দেখে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত দৌড়ে পালিয়ে যায় ঘাতক উজ্জ্বল।
ঘটনাস্থল থেকে রক্তাক্ত ও দগ্ধ রুবিনাকে স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করে হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। তবে এসিডে তার মুখমণ্ডলের সিংহভাগ এবং শ্বাসনালীর কিছু অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা উন্নত ও সুচিকিৎসার জন্য তাকে দ্রুত রাজধানী ঢাকার জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে রেফার করেন। বর্তমানে সেখানে রুবিনা আক্তার মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। এদিকে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে বহুলা ও আনন্দপুর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একজন নিরীহ কর্মজীবী নারীর ওপর এমন এসিড সন্ত্রাসের ঘটনায় জড়িত বর্বরের ফাঁসির দাবিতে ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা।
নৃশংস এই এসিড সন্ত্রাসের খবর পেয়ে হবিগঞ্জ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শহীদুল হক মুন্সী এবং সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা ভুক্তভোগীর পরিবারের সাথে কথা বলেন এবং আলামত সংগ্রহ করেন।গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শহীদুল হক মুন্সী জানান, এটি একটি অত্যন্ত জঘন্য এবং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিদর্শন করেছে এবং ভুক্তভোগীর খোঁজখবর রাখছে। ঘটনার মূল হোতা ও রুবিনার সাবেক স্বামী উজ্জ্বল মিয়াকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে। সম্ভাব্য সকল স্থানে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে। অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।” এই ঘটনায় হবিগঞ্জ সদর থানায় এসিড অপরাধ দমন আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে থানা পুলিশ নিশ্চিত করেছে।